|
শিক্ষাঃ ২০০-২৫০ টাকার বান্ডিলের মতোJayoti Biswas |
বেশিরভাগই কেউ কলেজে আসে না। শুধু পরীক্ষার দিনগুলোতে তাদের মুখ দেখতে পান অধ্যাপকরা। পরীক্ষার হলে উদ্ধার হয় গুচ্ছ গুচ্ছ চিট্। অধ্যাপকরা অবাক হয়ে দেখেন ছাত্রটি যে সাবজেক্টের চিট নিয়ে পরীক্ষা দিতে এসেছে তার আদতেও সেই সাবজেক্ট নেই। |
বিরোধীরা সব মিছে কথা বলে গন্ডগোল বাধায়! কী সব নাকি কলেজের ফি‘জ ইত্যাদি বাড়ানো হয়েছে, ইউনিয়ন নির্বাচন নেই তবুও ইউনিয়ন ফি‘জ আছে, কম্পিউটার ফি‘জ আছে কম্পিউটারও আছে কিন্তু সারাক্ষণ দরজায় তালা ঝোলে। এরম কতসব অভিযোগ। কিন্তু কই কেউ তো বলে না সাবজেক্ট পিছু পাশ করতে কলেজ ছাত্রদের খরচ এখন মাত্র ২৫০-৫০০ টাকা! শিক্ষাকে আরও বেশী ইনক্লুসিভ, ফ্লেক্সিবেল এবং দক্ষতা ভিত্তিক করে তোলার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ চালু করেছে। ভারতকে বিশ্বগুরু বানাতে হবে, উদ্দেশ্য সম্ভবত ভাল! অন্তত দাবী তেমনই। এহেন ভাল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি সেমিস্টারে ৭টি করে পেপার পড়তে হচ্ছে। অনার্সের ২টি পেপার, মাইনর ও আইডিসির ১টি করে পেপার, এইসির ১টি এবং সিভ্যাক ২টি। এরই মধ্যে তাদের করতে হবে ইন্টার্নশীপ, তাদের পড়ার বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। অনার্স-পাস দু‘ক্ষেত্রেই ইন্টার্নশীপ মাস্ট। এতে ছাত্র-ছাত্রীদের যেমন বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান বাড়বে তেমনি হাতে-কলমে শিক্ষাও তারা পাবে ইন্টার্নশীপের এর মাধ্যমে। গোটা পরিকল্পনাটাই ভীষণ ভাল, ছাত্র-ছাত্রীদের হলিস্টিক ডেভেলপমেন্টের জন্য। কিন্তু ফিল্ড রিপোর্ট কী বলছে? পরিকল্পনা ভাল কিন্ত তা সফল করার মত পরিকাঠামো নেই অর্ধেকের বেশী কলেজে। পশ্চিমবঙ্গের ডেটা বলছে প্রতি বছর কলেজে ভর্তির হার কমছে উদ্বেগজনকভাবে। এই বছরের ডেটা বলছে অগাষ্ট মাসের শেষেও সিট খালি পড়ে রয়েছে কলেজগুলোয়। উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল প্রকাশ হয়েছে ৭ই মে। এতগুলো মাস পরেও সিট ফাকা কেন? কোথায় যাচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীরা? বেশীরভাগই চলে যাচ্ছে বাইরের রাজ্যে। কেউ পড়তে কেউ বা পরিযায়ী হয়ে কাজের সন্ধানে। বেশ। যারা ভর্তি হল তাদের হালহকিকত কী রকম? এতগুলো পেপার পড়তে গিয়ে হিমসিম অবস্থা। পড়াশোনার বাইরে আর কোনো এক্সট্রা কারিকুলামে যুক্ত থাকতে পারছেনা তারা। চার বছরের কোর্সে মাল্টিপেল এক্সজিট থাকায় ড্রপআউট সংখ্যাও বেড়েছে। ইন্টার্নশিপ মাস্ট কিন্তু ইন্টার্নশিপ করাবে কারা তা নিয়ে কোন নির্দিষ্ট ঘোষণা নেই সরকারের পক্ষ থেকে। ফলত ইন্টার্নশিপ খুঁজতে গিয়ে ভোগান্তি হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের। একটু মফস্বলের কলেজগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। তাদের বেশিরভাগই কেউ কলেজে আসে না। শুধু পরীক্ষার দিনগুলোতে তাদের মুখ দেখতে পান অধ্যাপকরা। পরীক্ষার হলে উদ্ধার হয় গুচ্ছ গুচ্ছ চিট্। অধ্যাপকরা অবাক হয়ে দেখেন ছাত্রটি যে সাবজেক্টের চিট নিয়ে পরীক্ষা দিতে এসেছে তার আদতেও সেই সাবজেক্ট নেই। অথচ দেড় ঘন্টা ধরে সে তাই লিখে যাচ্ছে। সে কী কী বিষয় নিয়ে ভর্তি হয়েছে তা দেখার ফুরসৎ তার নেই। তাহলে এই চিট সে পেল কোথায়? প্রশ্ন করায় জানা গেল কলেজের বাইরে জেরক্সের দোকানগুলোয় আড়াইশো তিনশো পাঁচশো টাকায় বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ের প্রশ্ন উত্তরের মাইক্রো জেরক্স। হোম সেন্পটারের রীক্ষায় যে সকল প্রশ্ন এসেছে তার সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে সে মাইক্রো জেরক্সের উত্তর। কীভাবে? যে প্রশ্নের লিস্ট শুধুমাত্র অধ্যাপক এবং কলেজের অফিসে থাকার কথা তার হদিস কলেজের বাইরে জেরক্সের দোকানগুলো পাচ্ছে কী করে? কাদের মারফত চালান হচ্ছে প্রশ্নপত্র? এখানেও দুর্নীতি? যে ছাত্ররা সারা বছর কলেজ আসে না, পরীক্ষার দিন জেরক্সের দোকান থেকে মাইক্রো জেরক্স কিনে পরীক্ষা দিতে আসে, তাদের এই অবনতির কারণ কী? জিজ্ঞেস করলাম এক ছাত্রকে। সে খুব সাবলীল ভঙ্গিতেই বলল, আমরা তো কাজ করি। রোজ কলেজে আসলে কাজ করবো কী করে? কাজের মাঝে পড়াশোনার ফুরসৎ নেই, পড়াশোনা করার প্রয়োজনও নেই। তাই জেরক্সের দোকানই ভরসা। কয়েকশো টাকা দাও, ডিগ্রি কিনে নাও। জানতে পারলাম তার বাবা পরিযায়ী শ্রমিক। প্রায় সারা বছর বাইরেই থাকে। সংসারকে স্বচ্ছলভাবে চালাতে সেও কাজে ঢুকেছে। এমনিও পড়াশোনা করে কেউ আজকাল কাজ পাচ্ছে না তাই পড়াশোনার গুরুত্ব খুব একটা নেই তার কাছে। বাড়ি থেকে বলেছে তাই কলেজে ভর্তি হয়েছে। পরীক্ষাটুকু দিয়ে যায়। এরপর থেকে হয়তো এইটুকুও বন্ধ হয়ে যাবে। যে কারণে কলেজে ফাঁকা থেকে যাচ্ছে একাধিক সিট। পড়াশোনার মান এতটাই নেমেছে যে একটি সুষম খাদ্যের উদাহরণ লিখতে পারছে না ছাত্র-ছাত্রীরা। স্কুল থেকেই যে পড়াশোনা শিকেয় উঠেছে তা বোঝা যায়। ছাত্রীদের অবস্থা তো আরও শোচনীয়। অর্ধেকের বিয়ে হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তো মা‘ও হয়ে গিয়েছে। বাচ্চাকে গার্লস কমনরুমে রেখে এসে পরীক্ষা দিচ্ছে। এরপরই আমার খেয়াল হয় বাল্য বিবাহতে পশ্চিমবঙ্গ এখন দেশের প্রথম। রাজ্যে বন্ধ হয়ে গিয়েছে ৮ হাজারেরও বেশি স্কুল। গ্রামের কলেজগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ শিক্ষক শিক্ষিকা নেই কলেজগুলোতে। পুরোটাই চলছে গেস্ট টিচার দিয়ে। কলেজে ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হচ্ছে কেবলমাত্র বিভিন্ন প্রকল্প আর স্কলারশিপের টাকার জন্য। স্কলারশিপ এখন সবার জন্য। সেখানে মেধার কোনো স্থান নেই। মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রে আটকে যাচ্ছে অর্থনৈতিক কারণে। সমস্যা শুনে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের একজন বেশ জোর গলায় বললেন এটা কোনো সমস্যা নাকি! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড করে দিয়েছেন। সেখান থেকে লোন নিলেই তো হয়। তা না হয় হল, কিন্তু সেই লোন সুদ সমেত শোধ করার মত চাকরির সন্ধান আছে বাংলায়? কেন একজন ছাত্রকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য চড়া সুদে লোন নিতে হবে? কেন দূর্গা পুজোর বরাদ্দ বেড়ে ১ লাক্ষ ১০ হয় অথচ শিক্ষাখাতে টাকা বাড়ে না? উচ্চশিক্ষায় পর্যাপ্ত পরিমাণ স্কলারশিপের জায়গায় রাজ্য কেন ক্রেডিট কার্ডের বন্দবস্ত করে? ধর্মতলায় ধুমধাম করে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের জন্মদিন পালন করা হল। সেখানে নানান রকম ভাষণ হল, আলোচনা হল, গান হল, নাচ হল, খাওয়াদাওয়াও হল। এসবের জন্য আবার পরীক্ষা বাতিল করার আর্জিও জানানো হল। সবই হল। কিন্তু বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীদের এই করুন অবস্থা নিয়ে একটি শব্দও আলোচিত হল না। যে ছাত্র-ছাত্রীরা এই সমাবেশে যুক্ত হলেন তাদের মধ্যে বেশীরভাগই দিশেহারা। ভবিষ্যতে কী করবেন জানেন না। তারা কেন তৃণমূল ছাত্র পরিষদ করেন জানতে চাইলে তারা জানালেন অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। কী সুবিধা জানতে চাওয়ায় বললেন সব কি আর মুখে বলা যায়? আমরা বুঝি কী সুবিধা পাওয়া যায়। সবতো আর মুখে বলতে লাগে না। কিন্তু এ সুবিধা তো গুটি কয়েকের জন্য। গোটা পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রসমাজের কী হবে? কে ভাববে ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে? পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে? এর দায় কে নেবে? যে সকল শিক্ষক ভিসিকে পরীক্ষা বাতিলের আর্জি জমা দিলেন, তারা কি এর দায় এড়িয়ে যেতে পারবেন? যে অধ্যক্ষ তার কলেজের পরীক্ষা বাতিল করে, স্টেজে উঠে ছাত্র পরিষদের লোগো লাগানো জামা পড়ে সংগঠকের কাজ করা শুরু করে দিলেন, এ দায় তারও কি নয়? আর যারা নিজেদের ছেলে মেয়েকে শহরের ভাল স্কুল কলেজে পড়াতে পাঠান, উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে পড়তে পাঠান? সন্ধ্যাবেলা টিভিতে খবরের নাম করে যা কিছু চলে বেশ কিছুক্ষণ সেসব দেখে পশ্চিমবঙ্গের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই বলে একটি, দুটি বোতাম চিপে চ্যানেল বদলে দেন, এমন অবস্থার বদলে তাদেরও কি কিছুই করার নেই? অথচ আমরা সকলেই একটি সহজ সত্য জানি, জনসাধারণের ভোটে নির্বাচিত সরকার শুরু থেকে শেষ অবধি জনতারই প্রতিনিধি।
ব্যবহৃত ছবি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দ্বারা নির্মিত প্রকাশের তারিখ: ০২-সেপ্টেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|