প্রসঙ্গ গিগকর্মী: ইতিহাসের পথ ধরে (তৃতীয় পর্ব)

Chandan Mukhopadhyay

তৃতীয় পর্ব
গিগকর্মীদের জীবন যন্ত্রনা 
আজকের  আধুনিক সময়ে বিরাটভাবে একটা কথা প্রচার করা হয় যে এই 'গিগ অর্থনীতি' নিয়োগকর্তা এবং গিগ কর্মী দু দিক থেকেই  নাকি খুব ভালো ব্যবস্থা।যেমন, নিয়োগকোম্পানি, যখন খুশি তাদের কাজে নিতে পারে আবার প্রয়োজন না থাকলে বাদ দিতে পারে, কোন দায় বা দায়িত্ব নিতে হয় না। নিয়ম মেনে কাজ করবে, হিসাবের টাকা বুঝিয়ে দেবে, সম্পর্ক শেষ।  তাই কোম্পানির পক্ষে ভালো। আবার গিগ কর্মীদের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট কাজের  দিন বা সময় নেই, যেখান থেকে খুশি,যে কোন সময় তার ইচ্ছেমতো কাজ করতে পারে।অফিস যাবার দরকার নেই,যে কোনো কোম্পানি, প্রয়োজনে একাধিক কোম্পানিতে একসাথেও কাজ করতে পারে।  বাড়তি রোজগারের জন্যে পার্ট টাইম কাজ হিসাবেও করতে পারে ।কিন্তু কঠিন সত্যতা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

“The Oxford Internet institute online labour index 2021”  রিপোর্টে দেখাচ্ছে ভারতে লেবার মার্কেট শেয়ারে  গিগ কর্মী 24%, যেখানে বাংলাদেশে 16% আর আমেরিকায় 12%  2021 পর্যন্ত। বিশ্বব্যাপী অনলাইন কর্মী সংখ্যার ভারতের  অংশ 2017 সালে 25% থেকে 2021 সালে 33% হয়েছে৷ বাংলাদেশের  অনুরূপ সংখ্যা হল 10% এবং 15%(যা বর্তমান সময়ে অনেক বেড়ে গেছে )৷ নীতি আয়োগ এবং আইবিইএফ রিপোর্ট : অনুযায়ী  ই-শ্রম পোর্টাল : 14 জুন, 2024 পর্যন্ত, 29কোটিরও বেশি ই-শ্রম কার্ড জারি করেছে।

 ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) ভারতের গিগ অর্থনীতি এবং ডিজিটাল শ্রম প্ল্যাটফর্মের ভূমিকার উপর  প্রতিবেদন সহ গিগ কর্মীদের উপর একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনগুলি গিগ কর্মীদের জন্য সামাজিক  সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা প্রসারিত করার সমস্যাগুলি তুলে ধরে ।ভারতে গিগ কর্মসংস্থানের ভবিষ্যত উপর ILO রিপোর্ট থেকে সংক্ষেপে পাই :

* এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে এই কাজ পেতে কম অসুবিধা এবং সীমিত কাজের বিকল্পের কারণে এপ্রিল 2020 এর পরে  অনেক গিগ কর্মী গিগ অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছে। 

* ভারতে গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষার সম্প্রসারণ :এই প্রকল্পের লক্ষ্য গিগ কর্মীদের জন্য সামাজিক  নিরাপত্তা স্কিম তৈরি করা এবং তাদের জন্য আরও ভালো সুযোগ তৈরিতে সরকারকে সহায়তা করা। 

* ডিজিটাল শ্রম প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা সম্পর্কে প্রতিবেদন : বিশ্ব কর্মসংস্থান এবং সামাজিক আউটলুক 2021এই প্রতিবেদনে,  দেখা গেছে যে ডিজিটাল শ্রম প্ল্যাটফর্মের বেশিরভাগ কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা কভারেজ নেই। 

  • কাজের পরিবর্তনে ডিজিটাল শ্রম প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা : এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে বিশ্বব্যাপী অনলাইন গিগের সবচেয়ে বড় অংশ সফ্টওয়্যার উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির কাজের রিপোর্ট বলছে :,
  • গিগ কর্মীরা একটি অসংগঠিত কর্মীবাহিনী যাদের সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন।
  • ভারতে গিগ অর্থনীতি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে, গিগ কর্মীরা ভবিষ্যতে কর্মশক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তৈরি করবে।
  • সাম্প্রতিক মহামারী অনলাইন গিগের কর্মী ও কাজের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তনে আন্তে পারে। 

 ফেয়ারওয়ার্ক ইন্ডিয়া রেটিং 2024 - IIITB CITAPP :  2024 সালে ফেয়ারওয়ার্ক ইন্ডিয়া নিয়ে একটি প্রতিবেদন  প্রকাশ করেছে।এই  রিপোর্ট 2024 অনুসারে, Amazon Flex, Flipkart, Porter, Uber, Ola এবং অন্যান্য সংস্থা  মূল আন্ডার-পারফর্মার হিসাবে বাজারে সব থেকে বেশি গিগ কাজ করছে , যা ন্যায্য বেতন, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং গিগ কর্মীদের জন্য  সবরকম সুযোগসুবিধা  দেওয়া এবং কর্মীদের প্রতিনিধিত্বের মৌলিক মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

প্রতিবেদনটি ভারতে গার্হস্থ্য এবং ব্যক্তিগত পরিসরে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস সরবরাহ,খাদ্য সরবরাহ এবং  পরিবহনের মতো সেক্টরে অবস্থান-ভিত্তিক  পরিষেবা সরবরাহ করে এমন 11টি প্ল্যাটফর্মের মূল্যায়ন করে। গিগ অর্থনীতিতে উত্থান সত্ত্বেও, বেশ কয়েকটি কোম্পানি ন্যায্য শ্রমের মানের উপর ব্যাপকভাবে কম গুরুত্ত দিয়েছে ।

টাটা- মালিকানাধীন বিগবাস্কেট এই বছরের ফেয়ারওয়ার্ক ইন্ডিয়া সূচকে শীর্ষে রয়েছে,  তবে কোনও প্ল্যাটফর্ম সর্বোচ্চ  10 পয়েন্টের মধ্যে ছয়টির বেশি স্কোর করতে পারেনি এবং পাঁচটি নীতিতে কেউই প্রথম পয়েন্ট অর্জন করতে পারেনি। এটি পাঁচটি নীতির ওপর  প্ল্যাটফর্মের মূল্যায়ন করেছে: ন্যায্য বেতন, ন্যায্য শর্ত, ন্যায্য চুক্তি, ন্যায্য ব্যবস্থাপনা এবং ন্যায্য  প্রতিনিধিত্ব।শুধুমাত্র বিগবাস্কেট এবং আরবান কোম্পানি একটি ন্যূনতম মজুরি নীতি চালু করার জন্য ন্যায্য বেতনের  অধীনে প্রথম পয়েন্টে ভূষিত হয়েছিল যা তাদের সমস্ত কর্মীদের কাজের সাথে সম্পর্কিত খরচগুলিকে হিসাব  করার পরে কমপক্ষে ঘন্টায় স্থানীয় ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা দেয়।আর কোনো প্ল্যাটফর্ম ন্যায্য বেতনের অধীনে দ্বিতীয়  পয়েন্ট অর্জন করেনি।এছাড়াও   ভারতীয় গিগ সংস্থার ওপর স্টাডি করে জানায়, একটাও কোম্পানি ঘণ্টা পিছু  ন্যূনতম মজুরি তো দূর গাড়ির তেল, মেনটেনেন্স,ইন্সুরেন্স এর মতো জরুরি বিষয় গুলোর ক্ষেত্রেও কোন রকম দায় নেয় না।

 2017 Ernst and Young study on the “Future of Jobs in India” সমীক্ষায় জানায় ২০১৭ সালেই গোটা পৃথিবীর  গিগকর্মীদের 24% ভারতের গিগকর্মী। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রায় 40% গিগ কর্মী  ভারতে অবস্থিত।  আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াং  আরও উল্লেখ করেছেন , গিগ কাজের প্রায় 47% মাঝারি দক্ষ চাকরিতে, প্রায় 22% উচ্চ দক্ষ এবং প্রায় 31% কম দক্ষ চাকরিতে, বেশিরভাগই অকৃষি খাতে এবং বেশিরভাগই শহরাঞ্চলে কাজ করে। প্রবণতাটি নির্দেশ করে যে মাঝারি দক্ষতা সম্পন্ন  কর্মীদের অনুপাত ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে যখন নিম্ন ও উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কর্মীদের অনুপাত বাড়ছে।বর্তমানে আরো বৃদ্ধি  ঘটেছে।

রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক এবং গিগ শ্রমিকদের মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা নিয়ে  barandbench.com/law-firmsrabochhor এই নিয়ে সারাবছর সমীক্ষা চালায়। ওদের 2024এর ডিসেম্বরের সর্বশেষ প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ফ্রিল্যান্সিং কাজগুলি ঐতিহাসিকভাবে ভারতে দীর্ঘ সময়ের জন্য উপস্থিত রয়েছে, উদাহরণস্বরূপ, শিল্প সেক্টরে যেখানে অস্থায়ী  কর্মীদের প্রয়োজনীয় ভিত্তিতে নিযুক্ত করা হয়। অন-ডিমান্ড শ্রমিকদের ব্যক্তিগত পরিষেবার জন্য ভারতীয়রা   প্রায়শই ব্যবহার করে। যদিও ভারতের গিগ অর্থনীতি বিকশিত হচ্ছে, কিন্তু  পিরামিডের নীচে নিযুক্ত ব্যক্তিদের অত্যন্ত কঠিন অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই । সমীক্ষায় 10,000 ক্যাব চালক এবং শহরগুলিতে ডেলিভারি লোক অন্তর্ভুক্ত ছিল, রিপোর্টের ভিত্তি ছিল। সমীক্ষা অনুসারে, 86% ডেলিভারি স্টাফ সদস্য বলেছেন যে তারা 10-মিনিটের  দ্রুত ডেলিভারি সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত বলে মনে করেছেন। প্রায় 83% ক্যাব চালক প্রতিদিন 10 ঘন্টার বেশি কাজ করার কথা  জানিয়েছেন, যখন ডেলিভারি কর্মীদের 78% একই সময় কাজ করেছেন। 70% এরও বেশি ক্যাব ড্রাইভার এবং ডেলিভারি লোকেদের মাসিক আয় বেসিক বেতনের সীমার নীচে, যা পরিবারের খরচ চালনা করা কঠিন করে তোলে । ছুটির দিন না  থাকায় চালকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বেশি হয়। চালকদের মধ্যে, 99.3% শরীরে ব্যথা, দুর্যোগপূর্ণ  আবহাওয়ায় কাজ করা বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা অনুভব করেন। 98.5% অংশগ্রহণকারী বলেছেন যে এই কাজটি এক বা  একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করেছে, যেমন টেনশন, উদ্বেগ, আতঙ্ক, বিরক্তি, স্বল্প-মেজাজ এবং প্যানিক অ্যাটাক।

এমএমকে সারদানার একটি গবেষণাপত্র, নোটবন্দীকরণ, জিএসটি এবং প্রযুক্তির উইংসে ভারতীয় অর্থনীতির ফর্মালাইজিং শিরোনামে  ইনস্টিটিউট ফর স্টাডিজ ইন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট (ISID) দ্বারা প্রকাশিত রিপোর্টে বলছে,সামাজিক এবং কাজের নিরাপত্তার অভাব অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্য সমস্যার দিকে পরিচালিত করে।বিশেষ করে নির্দিষ্ট ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের 10-মিনিটের ডেলিভারি নীতির কারণে তারা সড়ক ট্রাফিক দুর্ঘটনার বাড়তি  ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। 41% চালক এবং 48% ডেলিভারি ব্যক্তি বলেছেন যে তারা সপ্তাহে একটি দিনও ছুটি নিতে পারছেন না। এছাড়াও অন্যান্য  সমস্যাগুলি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করে। রিপোর্টে বলা হয়, "এই বিভাগের বেশিরভাগ কোম্পানি, তাদের  প্রতিযোগিতামূলক  কাজ, তাদের ট্যাক্স এড়ানোর ক্ষমতা এবং ন্যূনতম মজুরি এবং অন্যান্য সুবিধার উপর বিধিবদ্ধ বিধানগুলিকে উপেক্ষা  করার ক্ষমতাই একমাত্র উপায় যা কোম্পানিগুলি বড়, সংগঠিত কোম্পানিগুলির  সাথে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হয়।

 

ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর অ্যাপ্লাইড ইকোনমিক রিসার্চ( NCAER) 2021 সালের ডিসেম্বরের “ব্যবসায়িক প্রত্যাশা”  সমীক্ষায় দেখা গেছে যে 93 শতাংশ সংস্থাগুলি অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের কথা জানিয়েছে। 28.5 শতাংশ সংস্থা  জানিয়েছে যে তারা স্বাস্থ্য বীমাতে কিছু সুযোগ দিয়েছে, এবং 11.5 শতাংশ বলেছেন যে তারা কোনও না কোনও সামাজিক সুরক্ষায়  অবদান রেখেছে। 65 শতাংশ সংস্থা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যে তারা আগামী ছয় মাসের মধ্যে কোনও 'স্থায়ী চাকরি'কে অস্থায়ী চাকরিতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা করছে না।

সাম্প্রতিক গবেষণার উঠে এসেছে, অ্যাপ-ভিত্তিক ক্যাব চালকদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ দিনে 14 ঘণ্টার বেশি কাজ করেন,  যেখানে 83%-এর বেশি মানুষ 10 ঘণ্টার বেশি কাজ করেন এবং 60%, 12 ঘণ্টার বেশি কাজ করেন।  গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের 43% এরও বেশি  তাদের সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে দিনে ₹500 বা মাসে ₹15,000 এর কম আয় করে। 80% এরও বেশি অ্যাপ-ভিত্তিক ক্যাব চালক কোম্পানিগুলির দেওয়া ভাড়ায় সন্তুষ্ট নয়, 73% অ্যাপ-ভিত্তিক ডেলিভারি ব্যক্তি তাদের হার নিয়ে অসন্তুষ্ট। ক্যাব চালকদের 68%  জানান সামগ্রিক ব্যয় তাদের উপার্জনের চেয়ে বেশি, যা প্রমাণ করে যে কীভাবে বিপুল সংখ্যক অ্যাপ-ভিত্তিক কর্মী ঋণে জড়িয়ে  থাকে।

2023 এ  G20 সম্মেলনে গিগ কর্মীদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায়  উঠে আসে, " গিগ অর্থনীতি এখন বিশ্বব্যাপী  শ্রমবাজারের 12 শতাংশের মতো দখল করে আছে , যা আগের তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণে বেশি। অনলাইন গিগ কর্মসংস্থানের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।  এই সেক্টরে নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে  উল্লেখযোগ্য অনেক  ঘাটতি রয়েছে।"এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে, G20 নিউ দিল্লির ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে দক্ষতার ফাঁকগুলি পূরণ করার অন্যতম উদ্দেশ্য  হিসাবে  'গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা এবং অনুকূল কাজের পরিস্থিতি নিশ্চিত করা' কে  অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।এর মূল উদ্দেশ্য গিগকর্মীদের  সম্মনজনক কর্মসংস্থানের সুযোগের অগ্রগতি এবং প্রত্যেকের জন্য  ব্যাপক সামাজিক  সুরক্ষা নীতি নিশ্চিত করা । G20, গিগ কর্মীদের কল্যাণকে সামনে রেখে - গিগকর্মীরা  যে 6টি বড়  চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়  তার একটা প্রাথমিক তালিকা তৈরী করে :

  1. বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, নিম্ন আয়ের দেশগুলিতে, বেশিরভাগ গিগ কর্মীরা শ্রম আইনের সুযোগের বাইরে এমন কাজে নিযুক্ত হন এবং তাদের প্রায়শই সামাজিক বীমা বা অন্যান্য সুবিধাগুলি পাবারই সুযোগ থাকে না।
  2. পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে,,অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মহিলারা পুরুষের উপার্জনের মাত্র 68 শতাংশ উপার্জন করে৷ এটি ডিজিটাল গিগ অর্থনীতিতে লিঙ্গ-ভিত্তিক মজুরি বৈষম্যের চলমান সমস্যাটিকে পরিষ্কার করে দেয় ।
  3. বেশিরভাগ কোম্পানি গিগকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা করে না, যার ফলে আয়ের কোনো স্থিরতা নেই এবং  ক্যারিয়ারের ভবিষ্যতের কোনো স্পষ্ট পথও দেখা যায়না ।এই পরিস্থিতি গিগ কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত  উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।
  4. সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় 50 শতাংশের বেশি গিগ কর্মীদের অবসরকালীন সঞ্চয়ের পরিকল্পনা করার কোনো সুযোগই নেই।  আর তাই অবসর গ্রহণের জন্য আর্থিক প্রস্তুতির কোনো সুযোগই প্রায় থাকে না এই গ্রুপের  কর্মীদের মধ্যে ।
  5. গিগ কর্মীরা আঞ্চলিক শ্রম আইন থেকে উদ্ভূত দুর্বলতার সম্মুখীন হয়, যার ফলে তারা অন্যায় আচরণ, শোষণ এবং কর্মক্ষেত্রে আঘাতের সম্মুখীন হতে পারে। শ্রম আইনের  পরিবর্তনগুলি করলে  বিভিন্ন স্থানে গিগ কর্মীদের সম্মুখীন হওয়া  চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকিকে কমাতে পারে  ।
  6. অনলাইন গিগ কাজের সাথে জড়িত থাকা ডেটা সুরক্ষা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা সম্পর্কিত অসুবিধাগুলির গুরুত্তপুর্ন হয়ে সামনে আসে। তাই, সরকারের পক্ষে তাদের সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষিত রাখতে এবং অনলাইন গোপনীয়তা বজায় রাখতে এই সমস্যাগুলির সমাধান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷

G20 দেশগুলো কী অর্জন করতে চায়?

ক) কর্মসংস্থান ওয়ার্কিং গ্রুপ প্ল্যাটফর্ম এবং গিগ অর্থনীতিতে জড়িত শ্রমিকদের আরও বিস্তৃত অংশের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কভারেজকে প্রসারিত করার লক্ষ্যে সুপারিশের একটি সেট তৈরি করতে G20 সদস্য দেশগুলির মূল্যবান অভিজ্ঞতা কার্যকর করতে চায় । এই প্রচেষ্টা গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষায় অগ্রগতি ট্র্যাক করার জন্য পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া তৈরিতে সহায়তা করবে, যার ফলে তাদের উপকার হবে এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।

খ) গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম কাজের মতো বিবর্তিত কাজের ধরণগুলিকে সঠিকভাবে পর্যালোচনা করার জন্য জাতীয়  পরিসংখ্যানগত ক্ষমতা এবং পদ্ধতিগুলি উন্নত করার পরামর্শ চায় । উপরন্তু, তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ার দক্ষতা বাড়ানোর  জন্য প্ল্যাটফর্ম এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য গভীর ভাবে কাজ করতে চায় ।

গ ) প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত পরিসংখ্যান তৈরি করা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম জুড়ে কর্মীদের বিভিন্ন গ্রুপের সাথে  সম্পর্কিত ডেটা সংগঠিত করবে। এটি G20 দেশগুলির মধ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলির দ্বারা প্রদত্ত সম্ভাব্য সুযোগগুলি আরও ভালভাবে বুঝতে নিয়োগকর্তা এবং কর্মীদের উভয়কেই ক্ষমতায়ন করবে৷

 

সেন্টার ফর লেবার স্টাডি এবং ন্যাশনাল ল স্কুলের সাথে যৌথভাবে মন্টফোর্ট সোশ্যাল ইনস্টিটিউট (MSI) একটা সমীক্ষা  চালায় ট্রান্সপোর্ট গিগ কর্মীদের ওপর। দেখে 12 ঘন্টা কাজ করে যা রোজগার করে,তার বেশিরভাগই চলে যায় তেল, মেন্টিনেন্স, ইএমআই এই সবেতেই। তাই সংসার চালাতে বাড়তি সময় কাজ করতে ৷Ipsos রিসার্চ pvt Ltd র survey 2024 অনুযায়ী গিগ কর্মীদের ক্ষেত্রে 88%  গিগ কর্মীরই এটাই প্রধান রোজগার। 75% গিগ কর্মী খুব আর্থিক সমস্যার মধ্যে  চলে। 2023 দিল্লিতে ব্লিঙ্কিটের ডেলিভারি এক্সিকিউটিভ রা ধর্মঘট করে। কারণ ওদের সাথে চুক্তি ছিল পার ডেলিভারি  50 টাকা পাবে। হঠাৎ  রাত 10 টায় নোটিশ দিলো ওটা 25টাকা করা হল , তারপর এখন আরো কমিয়ে 15টাকা করা হয়েছে।  সম্প্রতি  কয়েকটি কোম্পানি নতুন নিয়ম করেছে 5এর মধ্যে কমপক্ষে 4.7 রেটিং পেতে হবে, জব একসেপ্ট রেট 70% হতেই  হবে এবং মাসে 5টার বেশি ক্যান্সেলেশন করা যাবে না।এছাড়াও কমপ্লেন ,বেশি অফ ডে বা ছুটি নেওয়া ইত্যাদি ঘটলে  অ্যাকাউন্ট বা আইডি ব্লক করে দেওয়া হবে। গিগ কর্মীদের বিরুদ্ধে কমপ্লেন করার জায়গা আছে,কিন্তু ওরা কোথাও বিচার পাবে না। ওদের শুধু চ্যাট বট (chat bot)এ সব কিছু জানিয়ে  মেসেজ  পাঠাতে পারে। কিন্তু এখন প্রায় সব কোম্পানি  মানুষের জায়গায় এআই, এলগরিদম এবং ডিজিটাল সিস্টেমের ওপর সব যোগাযোগ ব্যবস্থা ছেড়ে দিয়েছে। তাই বিপদে  পড়লে সাহায্য করার বা কোন নির্দেশ দেবার মতো কোন মানুষ নেই। কাস্টমারের জন্যে ভালো। অর্ডার দেওয়া সহজ, কোন কমপ্লেন থাকলে টাকাও ফেরত দেবার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কর্মীদের ক্ষেত্রে কোনো পথ নেই।এখানেই কাস্টমারদের থেকে গিগ কর্মীদের আলাদা করে দেবার একটা সূক্ষ্ম খেলাও  কাজ করে যায়।  তাই এখন নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে গিগকর্মীরা  মাঝে মাঝেই ধর্মঘটের পথে যাচ্ছে। গত বছর গৌহাটিতে ওলা, উবের ধর্মঘটে যায় কারণ কোম্পানি তার লাভ বাড়াতে থাকে, আর কর্মীদের কমিশন কমাতে থাকে। একই মাসে হায়দ্রাবাদে ওলা, উবের ড্রাইভাররা ধর্মঘট করে।


প্রকাশের তারিখ: ০১-এপ্রিল-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org