‘স্তালিন – হিস্ট্রি অ্যান্ড ক্রিটিক অফ আ ব্ল্যাক লেজেন্ড’: একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য

Webdesk
লোসুর্দো দেখিয়েছেন যে শক্তিগুলির তরফ থেকে এই সমালোচনা উড়ে আসছে তারা সেই একই সময়ে তার থেকে বহুগুণ বেশি ভয়াবহ ও কৃষ্ণগহ্বরের মত অন্ধকার কর্মকান্ডে লিপ্ত ছিল, এসবই তারা সংশ্লিষ্ট আলোচনার সময় এড়িয়ে যায়।

ভূমিকা

আজ জোসেফ স্তালিনের ১৪৭-তম জন্মদিবস। দুনিয়ায় সমাজতন্ত্র ও তার অগ্রণী বাহিনীর অন্যতম নেতৃত্ব কমরেড স্তালিন। ইতিপূর্বে কয়েক বছরে তাঁর কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্পর্কে কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছি। এবছর বেছে নেওয়া হয়েছে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বই। ‘হিস্ট্রি অ্যান্ড ক্রিটিক অফ আ ব্ল্যাক লেজেন্ড’- লিখেছেন ডমিনিকো লোসুর্দো। আজকের প্রতিবেদন আসলে এক পর্যালোচনা। কমরেড স্তালিনের নয়, ঐ বইতে লোসুর্দো যা লিখেছেন তার। আলোচনা করেছেন রবিকর গুপ্ত।  

এ প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য কমরেড জোসেফ স্তালিনের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। ১৯৬৮ সালে বর্ধমানে আয়োজিত পার্টির কেন্দ্রীয় প্লেনামে গৃহীত আদর্শগত প্রস্তাব থেকে সংগৃহীত একটি অনুচ্ছেদই ওয়েবডেস্কের তরফে ভুমিকার শেষ কথা- “আমাদের একথা বলা দরকার যে আধুনিক সংশোধনবাদী নেতারা যেভাবে স্তালিনের ভূমিকাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন তার সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ ও শান্তি, সর্বহারার শ্রেণী-কর্তৃত্ব স্থাপন ও সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব সম্পর্কে, পরাধীন ও ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টির প্রকৃতি, চরিত্র এবং ভূমিকা সম্পর্কে একাদিক্রমে বহু মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব ও বক্তব্যের বিরুদ্ধে তাঁদের আক্রমণ চালিয়ে যাবার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

কিন্তু আধুনিক সংশোধনবাদীদের এইরকম সমস্ত অপচেষ্টা সত্ত্বেও স্তালিনের নাম মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সঙ্গে চিরদিন অচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকবে।”

রবিকর গুপ্ত

১৯৫৩ সালের ৫-ই মার্চ সোভিয়েত বেতার তরঙ্গে যখন জোসেফ স্তালিনের মৃত্যু সংবাদ ভেসে এল, তখন সোভিয়েত সঙ্ঘের ভেতরে ও বাইরের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে তা ধরা দিল একটি ব্যক্তিগত শোক হিসেবে। সেই সময়ের স্মৃতিচারণায় অনেকেই লিখেছেন, তাঁদের মনে হয়েছিল যেন তাঁদের পিতা প্রয়াত হয়েছেন। মস্কো, লেনিনগ্রাদ, প্রাগ, বুদাপেস্ট সর্বত্র রাস্তায় সেইদিন দেখা মিলেছিল অশ্রুসজল চোখে জমায়েত হওয়া শোকার্ত মানুষের। চলমান ঠান্ডা যুদ্ধের বাতাবরনেও পশ্চিমেও ভেসে উঠেছিল একই প্রকার ছবি। সেখানেও ব্রিটেনে ‘আঙ্কেল জো’-এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে পাবে পাবে চলেছিল প্রাক্তন সৈনিকদের বিয়ারের ঠোকাঠুকি, আমেরিকার কাগজে কাগজে ছাপা হয়েছিল যে সব কূটনীতিবিদ ও সেনানায়করা স্তালিনের সংস্পর্শে এসেছিলেন তাঁদের উষ্ণ স্মৃতিচারণা। ত্রৎস্কির গভীর অনুরাগী ও জীবনী লেখক ইতিহাসবিদ আইজ্যাক ডয়েশ্চার স্তালিন সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছিলেন – ‘স্তালিনের কৃতিত্বের মূল কথা হল তিন দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের আমূল পরিবর্তন – যখন তিনি ক্ষমতায় এলেন তখন সে দেশে কাঠের লাঙলের যুগ আর যখন তিনি চলে গেলেন তখন তা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পোন্নত পরমাণু শক্তিধর দেশ।’ ইতালির খ্রিস্টান প্রজাতন্ত্রী দলের প্রধানমন্ত্রী ও কট্টর কমিউনিস্ট বিরোধী আলচিদে দে গাস্পেরি প্রশংসা করে বলেন, ‘যে সময়ে হিটলার-মুসোলিনির মত নেতারা জাতিবিদ্বেষের বন্যায় নিজের নিজের দেশকে ডুবিয়ে দিচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়ে আমরা দেখেছি স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত দেশের ১৬০ টি জনজাতি একত্রিত হয়ে নিজের দেশের জন্য জীবনপণ করেছিল। মানবজাতির মধ্যে এই একতা প্রচেষ্টার প্রয়াসকে আমি একটি খ্রিস্টান মূল্যবোধ মনে করি।’ ডান-বাম নির্বিশেষে বহু বুদ্ধিজীবীদের তরফ থেকেই স্তালিন সম্পর্কে উষ্ণ মূল্যায়ন ভেসে আসে। প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন বেনেদিত্তো ক্রোচে ও টমাস মান। প্রাক্তন রুশ শ্বেত বাহিনির জনৈক উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার স্তালিনকে তুলনা করেন পিটার দ্য গ্রেটের সঙ্গে। আইজেনহাওয়ার বলেন যুদ্ধের সময় স্তালিনের সামরিক বিচক্ষণতার কথা।

ঘরে ও বাইরে এবং রাজনৈতিক মতামত নির্বিশেষে রাষ্ট্রনেতা হিসেবে যাঁর মর্যাদা এমন উচ্চতায় ছিল, কয়েক বছরের ব্যবধানেই তা কীভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল সোভিয়েত দেশের ভেতরে ও বাইরে? সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টা করা হয়েছে ডমিনিকো লোসুর্দোর ‘স্তালিন – হিস্ট্রি অ্যান্ড ক্রিটিক অফ আ ব্ল্যাক লেজেন্ড’ গ্রন্থে।

মূল গ্রন্থের আলোচনার আগে লেখক সম্পর্কে একটি ছোটো আলাপ জরুরি। লোসুর্দোর জন্মস্থান দক্ষিণ ইতালির সানিকান্দ্রো দি বারি। তিনি উর্বিনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি পরবর্তীকালে ‘ইন্সটিটিউট অফ ফিলোজফিক্যাল অ্যান্ড পেডালজিক্যাল স্টাডি’-এর ডাইরেক্টর হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ ব্যতীত তিনি ‘হেগেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন’ এর প্রেসিডেন্ট ও ‘মার্কস XXI’ নামক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ডাইরেক্টরও ছিলেন। বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্রেই শুধু মাত্র তাঁর মার্কসবাদ সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন ইতালির সেই যুবকদের একজন, যারা ৬০-এর দশকের ঝঞ্ঝাময় দিনগুলিতে রাজনৈতিক পরিপক্কতা অর্জন করেছিল। সোভিয়েত-চিন বিভাজনে ইতালির কমিউনিস্ট পার্টিতে যে বিভাজন দেখা যায়, তাতে লসুর্দো সংশোধনবাদ বিরোধী চিনপন্থী গোষ্ঠীর পক্ষ নেন। যদিও পরবর্তীকালে এই অবস্থান থেকে তিনি সরে আসেন ও ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। নব্বইয়ের দশকে ইতালির কমিউনিস্ট পার্টি লুপ্ত হলে এই কমিউনিস্ট রিফাউন্ডেশন আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

দর্শনের ইতিহাস ছিল লোসুর্দের মূল আলোচনার বিষয়। সোভিয়েতের পতনের পর নব্য-উদারবাদ যখন নিজেকে মানবপ্রগতির সর্বাগ্রগণ্য মতাদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত ছিল, তখনই লোসুর্দ এই মতবাদের উৎস ও তার ইতিহাস নিয়ে লেখেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লিবেরালিজম – আ কাউন্টার হিস্ট্রি’। তাঁর মতাদর্শিক সমালোচনা এতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পশ্চিমের শিল্পোন্নত দেশগুলির মার্কসবাদ, যা শ্রেণি সংগ্রাম ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতাকে বর্জন করে পরিচিতির রাজনীতির দিকেই বেশি জোর দিয়েছে, তার উৎস ও গতিপথ জরিপ করে তাঁর রচনা ‘ওয়েস্টার্ন মার্কস্‌সিজম্‌’-ও বিদ্যায়তনিক মহলের ভেতরে ও বাইরে আদ্রিত হয়েছে। তবে তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ সম্ভবতঃ ‘স্তালিন : হিস্ট্রি অ্যান্ড ক্রিটিক অফ আ ব্ল্যাক লেজেন্ড’। আজকের আলোচনা এই বইটি নিয়েই।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, এই বইটি কিন্তু স্তালিনের জীবনী নয়। এই বইটি আদতে স্তালিন-কে ঘিরে যে ‘ব্ল্যাক লেজেন্ড’ রয়েছে তার জীবনী। এই ‘ব্ল্যাক লেজেন্ড’ বিষয়টি কী ? ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যখন একদিকে প্রোটেস্ট্যান্ট ইংরেজ-ডাচ শক্তি ও অন্যদিকে ক্যাথোলিক স্প্যানিশ শক্তির মধ্যে আমেরিকায় উপনিবেশ গঠন নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে, তখনই ‘ব্ল্যাক লেজেন্ড’-এর উদ্ভব।  প্রোটেস্ট্যান্ট শক্তিগুলি উপলব্ধি করে স্পেনকে ধরাশায়ী করতে শুধু অসি নয়, মসীর যুদ্ধেও জয়লাভ করতে হবে। তাই তারা একের পর এক পুস্তিকা প্রকাশ করে ইউরোপের বিদ্বজ্জনদের মধ্যে প্রচার করতে থাকে স্পেন একটি উগ্র, ধর্মান্ধ, গণহত্যাকারী শক্তি। এমন নয়, স্পেন ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে আমেরিকাতে কোনো অত্যাচার অনাচার করেনি, অবশ্যই করেছিল। কিন্তু ইংল্যান্ড-ওলন্দাজদের মত প্রোটেস্ট্যান্ট শক্তিগুলির ভূমিকা ছিল তার থেকে বহুগুণে নিন্দনীয়। এর প্রমাণ বর্তমান যুগেও দেখা যায়। আমেরিকায় যে সকল অঞ্চল স্পেনের উপনিবেশ ছিল, সেখানে আজও আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির অস্তিত্ব রয়েছে। এছাড়া তাদের সংস্কৃতির অনেক কিছুই সাগরপার থেকে আগত স্প্যানিয়ার্ডরা গ্রহণ করেছে। অধিকাংশ দেশেই এখন স্প্যানিশ-আদিবাসী মিশ্র জনজাতিই সংখ্যাগরিষ্ঠ। অপরদিকে ব্রিটিশ-ওলন্দাজ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলিতে আদিবাসীরা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, তাঁদের সংস্কৃতি কখনই মূলধারায় স্বীকৃতি লাভ করেনি, আগত ইংরেজ বা ডাচদের সঙ্গে তাদের কোনোরকম বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত না হওয়ায় মিশ্র জনজাতিরও কোনো অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ ‘ব্ল্যাক লেজেন্ড’-এর প্রচারকদের অভিযোগ ছিল আদতে তাঁদের নিজেদের প্রবল অপরাধেরই স্বীকারোক্তি।

এ উপমাটি-ই লোসুর্দো ব্যবহার করেছেন স্তালিন প্রসঙ্গে। তিনি স্তালিনের নেতৃত্বে পরিচালিত সোভিয়েতে যে সকল সমস্যাগুলি জন্ম নিয়েছিল তাকে অস্বীকার করেননি। এ গ্রন্থে তিনি দুটি কাজ করেছেন। এক, সোভিয়েত সঙ্ঘের সেই ঘটনাগুলিকে তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে স্থাপন করেছেন আর দুই, তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন যে শক্তিগুলির তরফ থেকে এই সমালোচনা উড়ে আসছে তারা সেই একই সময়ে তার থেকে বহুগুণ বেশি ভয়াবহ ও কৃষ্ণগহ্বরের মত অন্ধকার কর্মকান্ডে লিপ্ত ছিল, এসবই তারা সংশ্লিষ্ট আলোচনার সময় এড়িয়ে যায়।

গ্রন্থটিকে ভূমিকা ও উপসংহার বাদে লোসুর্দো আটটি অধ্যায়ে  বিভাজিত করেছেন। ভূমিকা (দ্য টার্নিং পয়েন্ট ইন দ্য হিস্ট্রি অফ দ্য ইমেজ অফ স্তালিন) ও প্রথম অধ্যায়ে (হাউ টু কাস্ট আ গড ইন্টু হেল : দ্য খ্রুশ্চেভ রিপোর্ট)-এ লোসুর্দো খোঁজার প্রচেষ্টা করেছেন ঠিক কোন মুহূর্ত থেকে স্তালিন তাঁর বৈশ্বিক মর্যাদা হারিয়ে হিটলারের পাশের আসনটি গ্রহণ করলেন। এই প্রেক্ষিতে তিনি প্রাথমিক ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতি কংগ্রেসে খ্রুশ্চেভের ‘গোপন ভাষণ’-কে। ঐ ভাষণে উত্থাপিত প্রায় সবক’টি অভিযোগই তিনি খন্ডন করেছেন তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে। এখানে একটি লক্ষ্য করার মত বিষয় আছে, নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি নির্মাণে লোসুর্দো যে সূত্রগুলি নিয়ে এসেছেন, তার উৎস প্রায় সবই অ-কমিউনিস্ট বা কমিউনিস্ট বিরোধী। এটি তিনি করেছেন খুব সচেতন ভাবেই। লোসুর্দোর বর্তমানের কমিউনিস্ট চর্চা নিয়ে অন্যতম সমালোচনা হল, যে তা কমিউনিস্টদের কন্ঠকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান তো করেই না – অ-কমিউনিস্ট উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যেরও খুব সচেতন ভাবে বাছবিচার করে। যেমন স্তালিনের ক্ষেত্রেই, ‘হিউজ, গ্রিম, হুইমজিক্যাল, মর্বিড, হিউম্যান মনস্টার’-এমন চিত্রায়নের সঙ্গে যে তথ্য যায় না, তার উৎস অ-কমিউনিস্ট হলেও সেটি বাদ দেওয়া হয়। এই অনুশীলনকে খন্ডন করতেই এবং তার ত্রুটিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতেই তিনি এই প্রয়াসটি করেছেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়, ‘দ্য বলশেভিকস্‌ : ফ্রম আইডিওলজিক্যাল কনফ্লিক্ট টু সিভিল ওয়ার’-এ লোসুর্দো স্তালিন যুগকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠা করার কাজটি শুরু করেছেন। এই অধ্যায়ের প্রেক্ষিতায়নের কাজটি স্তালিন যুগের নিকট ইতিহাস নিয়ে। এখানে লোসুর্দো দেখাতে প্রচেষ্টা করেছেন স্তালিন যুগের সমস্যাগুলির উৎস কীভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও রুশবিপ্লবের সময়ের বিবিধ ঘটনাবলী থেকে উদ্ভূত। এখানে লোসুর্দোর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল ১৯১৭ থেকে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ – এই কালপর্বের মধ্যে রাশিয়ায় তিনটি গৃহযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একটি গৃহযুদ্ধ ছিল বলশেভিক শক্তি বনাম বিবিধ পুঁজিবাদী শক্তি সমর্থিত শ্বেত বাহিনির বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ ছিল ১৯২৮ থেকে উপর ও নিচ থেকে বিপ্লব প্রচেষ্টার যাতে গ্রাম ও শহরে সামাজিক ক্ষেত্রে সুতীব্র শ্রেণি সংঘাত পরিলক্ষিত হয়। পরিশেষে, তৃতীয় গৃহযুদ্ধ ছিল বলশেভিকদের নিজেদের মধ্যে, যেখানে মূল সংগ্রাম ছিল একই সঙ্গে আদর্শিক (বিপ্লব কোন পথে যাবে) ও ক্ষমতার (সোভিয়েত সঙ্ঘের বিশাল জাহাজের ক্যাপ্টেন কে হবে)। লোসুর্দো এই তিনটি গৃহযুদ্ধ কীভাবে একটি আরেকটির সঙ্গে জড়িত ছিল এবং তার বিবিধ শক্তিগুলি কীভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে খাড়া হয়েছিল তার একটি খুবই মনোজ্ঞ বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি কোনো সহজ উত্তর দেননি, অসম্ভব জটিল ও বহুমাত্রিক সংঘাতকে জটিল ও বহুমাত্রিক ভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন। এইখানেই খ্রুশ্চেভ (বা কিছুটা ত্রৎস্কি-র) স্তালিনকে সমস্ত সমস্যার জন্য একমাত্রিক ভাবে দায়ী করার সহজ সরল ভাষ্যটি, যা পশ্চিমি স্তালিন বিশ্লেষণে আজও নানাভাবে প্রতিধ্বনিত হয়, প্রবল ভাবে ধাক্কা খেয়েছে।

প্রেক্ষিতায়নের এ কাজটিই অব্যহত থেকেছে তৃতীয় অধ্যায় ‘বিটুইন দ্য টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি অ্যান্ড দ্য লং ডুরে, বিটুইন দ্য হিস্ট্রি অফ মার্কসিজম্‌ অ্যান্ড দ্য হিস্ট্রি অফ রাশিয়া : দ্য অরিজিনস্‌ অফ ‘‘স্তালিনিজম্‌’’ ’-এ। এখানে লোসুর্দো স্তালিন যুগের নিকট ইতিহাস থেকে সরে গিয়ে আরও দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুগকে বিশ্লেষণ করেছেন। এই ক্ষেত্রে তাঁর মূল বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্র হিসেবে ও সভ্যতা হিসেবে রুশ সাম্রাজ্যের যে ইতিহাস তার একটি আলাদা ওজন রয়েছে। রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক কাঠামো তার রাজনীতির ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। ১৯১৭ সালে প্রথম যখন বিপ্লব হল, তখন অধিকাংশ কমিউনিস্ট নেতাদেরই (লেনিনের মত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) ধারণা ছিল তাঁরা অতি সহজেই ইতিহাস ও ভূগোলের এই বিপুল বোঝা অতিক্রম করে ফেলতে পারবেন। মার্কসের ‘লুই বোনাপার্টের অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার’-এ লেখা বক্তব্য অনেকেই ভুলে গেছিলেন বা গ্রাহ্য করেননি – মানুষ ইতিহাস গড়ে কিন্তু সে তা নিজের মর্জি মত গড়ে না, অতীত থেকে আগত বোঝা তার ঘাড়ে বেতালের মত চেপে থাকে। লোসুর্দো রাশিয়ার বড় সময়ের ক্যানভাসে সেই বেতালের চিত্রই এঁকেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল আদতে একটি দ্বৈত সভ্যতা। নতুন একটি সভ্যতা, সোভিয়েত সভ্যতার প্রয়াস বহুক্ষেত্রেই বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে তার ঘাড়ে চেপে থাকা রুশ সভ্যতার বেতালের সাংস্কৃতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা দ্বারা। স্তালিন যুগের অনেক ‘ত্রুটি’ বা ‘বিচ্যুতি’-র উৎস সন্ধান পাওয়া যাবে সেখানেই।

চতুর্থ অধ্যায় ‘দ্য কমপ্লেক্স অ্যান্ড কন্ট্রাডিক্টারি কোর্স অফ দ্য স্তালিন এরা’-তে লোসুর্দো স্তালিন যুগে সক্রিয় বিবিধ শক্তিগুলির কার্যকলাপের একটি রেখাচিত্র অঙ্কন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন স্তালিন কখনই, এমনকি তাঁর ক্ষমতার শীর্ষেও, হিটলারের মত কোনো একছত্র শাসক ছিলেন না। তাঁর নির্দেশই আইন, বিষয়টি এমনও ছিল না। বহু ক্ষেত্রেই তাঁকে পিছু হঠতে হয়েছে, তাঁর বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে গৃহীত হলেও তার প্রয়োগ হয়নি এবং তাঁকে সোভিয়েত সঙ্ঘের ও কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যের বিবিধ শক্তিগোষ্ঠীগুলির সঙ্গে নানা প্রকার বোঝাপড়ায় আসতে হয়েছে। এই প্রসঙ্গে এসেছে সোভিয়েত সঙ্ঘের মধ্যে চেকা বনাম কমিউনিস্ট পার্টির সংঘাতের একেবারে অনালোচিত বিষয়টি (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই বিষয়টি কিন্তু রাশিয়ায় খুবই আলোচিত ও সর্বজনবিদিত বিষয়। ইউরি এমিলিয়ানভের বেশ কিছু গবেষণা গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ ব্যতীত ইংরেজি ভাষার জগতে এই সংঘাতের বিশেষ গভীর আলোচনা পাওয়া যায় না।)। এই অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে গুলাগ প্রসঙ্গ, স্বৈরতন্ত্র প্রসঙ্গ ও সর্বহারার একনায়কতন্ত্র কতটা পার্টির একনায়কতন্ত্র ও পরিশেষে ব্যক্তির একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল সেই প্রসঙ্গও।

লোসুর্দো পঞ্চম থেকে অষ্টম অধ্যায়ে (‘ইরেজার অফ হিস্ট্রি অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন অফ মিথলজি : স্তালিন অ্যান্ড হিটলার অ্যাজ্‌ টুইন মনস্টার’, ‘সাইকোপ্যাথি, মোরালিটি, অ্যান্ড হিস্ট্রি ইন দ্য রিডিং অফ দ্য স্তালিন এরা’, ‘দ্য ইমেজ অফ স্তালিন বিটুইন হিস্ট্রি অ্যান্ড মিথলজি’, ‘ডেমোনাইজেশন অ্যান্ড হ্যাগিওগ্রাফি ইন দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অফ দ্য কন্টেম্পোরারি ওয়ার্ল্ড’) সরাসরি তথ্য আলোচনার থেকে সরে গিয়ে তত্ত্বে প্রবেশ করেছেন এবং স্তালিনকে কেন্দ্র করে নির্মিত ব্ল্যাক লেজেন্ডের নানা দিক থেকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। স্তালিন কীভাবে হিটলারের সঙ্গে তুলনীয় রাক্ষস হলেন, কারা তাকে রাক্ষস বানালো, এই প্রচারের পর এখনও কেন রাশিয়ায় তাঁর প্রভূত জনপ্রিয়তা রয়েছে তার সুলুক সন্ধান করেছেন লোসুর্দো এই অধ্যায়গুলিতে। বিশ্লেষণ করেছেন নীতি-নৈতিকতা প্রসঙ্গে পশ্চিমের শক্তিগুলির দ্বি-চারিতার। পরিশেষে, বিপ্লব বা বিপ্লব পরিচালকদের এই প্রকার ‘ব্ল্যাক লেজেন্ড’ খাড়া করার ঐতিহ্য কীভাবে ফরাসী বিপ্লব থেকেই বহমান, দিয়েছেন তারও একটি মনোজ্ঞ সুচিন্তিত বিশ্লেষণ।               

যাঁরা এইরকম কিছু শুনতে চান, যে স্তালিন জীবনে কোনো ভুল-ভ্রান্তি করেননি বা সোভিয়েত সঙ্ঘের চলার পথ সর্বদা সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পথেই পরিচালিত হয়েছেন – তাঁদের লোসুর্দোর এই গ্রন্থ ভালো লাগবে না। তাঁর উদ্দেশ্য স্তালিন বন্দনা নয়। তাঁর উদ্দেশ্য স্তালিনকে রাক্ষস বা দানব থেকে আবার রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। উদ্দেশ্য যে বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সোভিয়েত সঙ্ঘকে রক্তসাগর ঠেলে অগ্রসর হতে প্রায় বাধ্য করেছিল সেই প্রেক্ষিতের বিশ্লেষণ। তিনি এই উদ্দেশ্য সাধনে দুই ভাবে অগ্রসর হয়েছেন। একাধারে তিনি স্তালিন কীভাবে দানব হলেন, তাঁকে ঘিরে কীভাবে ‘ব্ল্যাক লেজেন্ড’ গড়ে উঠল তার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন আর অন্যদিকে কীভাবে কাছের ও দূরের বিবিধ ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত সোভিয়েত সঙ্ঘের চলার পথকে সীমাবদ্ধ করে তুলেছিল এবং স্তালিন সহ সোভিয়েত নেতৃত্বকে বিভিন্ন কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণে (যার রক্তমূল্য ছিল বিপুল) বাধ্য করেছিল তার প্রেক্ষিতায়ন করেছেন। এই দুটি কাজই তিনি তিনি করেছেন অত্যন্ত নিপুণ ভাবে। যাঁরা তাই পূর্বনির্ধারিত ধারণা বিসর্জন দিয়ে স্তালিন ও স্তালিনযুগ প্রসঙ্গে একটি বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ খোলা মনে পাঠ করতে চান, তাঁরা লোসুর্দোর বইটি অবশ্যই হাতে তুলে নিতে পারেন। 


প্রকাশের তারিখ: ২১-ডিসেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org