|
ব্যক্তির নাম বড়, না পার্টির কাজ? -প্রতীকউর রহমান...Pratikur Rahaman |
|
২৩ মার্চ ২০২৩ একটি মজবুত আর ব্যাপক সংগঠন অন্ধকার একটুকরো ঘরে আলোচনা চলছে রামপ্রসাদ বিসমিল কে কিভাবে জেল থেকে মুক্ত করা যায়। ভগৎ সিং, শিব বর্মা ও জয়দেব। শারীরিক গঠনে জয়দেব, শিব বর্মা অপেক্ষা অনেক শক্তিশালী ও মারকুটে স্বভাবের, তাই ভগৎ সিং ঠিক করেন সে ও জয়দেব বিসমিল মুক্ত অ্যাকশনে যাবে। শিবের নিজের দুর্বল শরীর এর উপর খুব রাগ হচ্ছিল, নিজেকে পার্টির কাজের যোগ্য বলে মনে হচ্ছিল না, চুপ করে ঘুমানোর ভান করেই শুয়ে ছিলেন, পাশেই ভিক্টর হুগোর উপন্যাস পড়ছিলেন ভগৎ সিং, আস্তে করে ডাকলেন শিব! একটা কথার উত্তর দাও। ব্যক্তির নাম বড়, না পার্টি র কাজ? উল্টো দিকের বক্তা বলেন পার্টির কাজ। আর পার্টির কাজ যাতে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চলে, আমাদের সব ' অ্যাকশন' যাতে সফল হয়, দেশবাসীর কাছে আমাদের কথা যাতে নিয়মিত ভাবে পৌঁছোয়, আমাদের এই স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রত্যেকটি স্তরে আমরা সাফল্য লাভ করতে পারি তার প্রথম শর্ত কী? ও বললো , সংগঠন আর প্রচার। দেশের জনসাধারণ আমাদের সাহস আর আমাদের নানান কাজের প্রশংসা করলেও আমাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করতে পারছে না। এখনও আমার খোলাখুলি তাদের এ কথাও বলতে পারছিনা যে, আমরা যে স্বাধীনতার কথা বলছি তার কাঠামো কেমন হবে, ইংরেজ চলে যাবার পর যে সরকার হবে, তা কেমন হবে, কারা হবে। আমাদের আন্দোলনকে গণভিত্তি দেবার জন্য আমাদের অভীষ্ট কে জনসাধারনের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে। জনসাধারণের সমর্থন না পেলে পুরানো কায়দায় দু-একজন ইংরেজ কর্মকর্তা বা সরকারি টিকটিকি কি রাজসাক্ষী কে মেরে আমাদের আর চলবে না। কিছুক্ষন চুপ থেকে আবার বলা শুরু করলো, আমরা সবাই সৈনিক। সৈনিকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ রণক্ষেত্রের প্রতি। তাই অ্যাকশন এ যাবার কথা উঠতেই সবাই উন্মত্ত হয়ে ওঠে। তবু আন্দোলন এর কথা মনে রেখে কাউকে না কাউকে তো অ্যাকশন-এর মোহ ছাড়তে হবে। সাধারণত অ্যাকশন এ যারা লড়ে বা ফাঁসি তে ঝোলে, শহীদত্বের বরণমালা তাদের গলায় পড়ে, এ কথা ঠিক। ইমারতের সিংহ দরজায় হীরার যে অলংকরণ, এদের মূল্যও তাই। অথচ ইমারতের দিক থেকে দেখতে গেলে, ভিতের নিচে চাপা পড়া একটা পাথরের তুলনায় এদের মূল্য কিছুই নয়। এযাবৎ আমাদের আন্দোলন হীরা উপার্জন করেছে, বনেদের পাথর জড়ো করতে পারি নি। তাই এত ত্যাগ পরেও ইমারত তো দূরের কথা, তার কাঠামো পর্যন্ত আমরা খাড়া করতে পারি নি, আজ আমাদের প্রয়োজন বনেদের পাথর। ত্যাগ আর আত্মবলিদানের ও দুটো রূপ। এক হলো গুলি বা ফাঁসিতে লটকে মরা। এর চমকটাই বেশি, কষ্ট টা কম। দ্বিতীয়টা হলো পিছন থেকে সারাজীবন ইমারতের বোঝা বয়ে বেড়ানো। সময়ের সঙ্গে নিজের পথ এর প্রতি অবিচল থেকে নিজের পথ ত্যাগ না করে, ইমারতের বোঝায় যাদের পা টলে না, কাঁধ বাঁকে না, তিল তিল করে যারা নিজেদের গলিয়ে যায়, জ্বালিয়ে যায় যাতে প্রদীপ এর জ্যোতি মলিন না হয়, নিস্তব্ধ পথে যাতে আঁধার না ছেয়ে আসে, সেই সব লোকের ত্যাগ ও আত্মবলিদান কি প্রথম দের তুলনায় বেশি নয়? " এতদিন পর এই সময় আমরা দেখি আমাদের নেতারা যখন বলেন ব্যক্তি নয় পার্টি বড় সব সময় মনে রাখবে, তখন মনে হয় কতদিন আগে ভগৎ সিং এর বলে যাওয়া কথা গুলো কতটাই সত্য! পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি...
সে মাটি তে রাইফেল পুঁতবে...!!!
জেল খানার নোটবুক তাঁর জেল খানার নোট বুক ৫০,৫১,৫৩,৫৬,৫৭,৬০,৬১,৬২,৬৩,৬৪,৬৫,৬৯,৭০,৭১,৭২,৭৩,১০১,১০২, নং পৃষ্টা থেকে জানতে পারি। ১৯২৮সালের ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক হয়, ঠিক হয় সংগঠনের নামের সঙ্গে যুক্ত করা হবে 'সোশ্যালিস্ট' শব্দটি। তৈরি হলো হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন। মার্কিন কায়দায় ফেডেরাল রিপাবলিক আর নয় এবার লক্ষ্য রুশ কায়দায় সোস্যালিস্ট রিপাবলিক। ১৯২৮সালে ৩০শে অক্টোবর সাইমন কমিশন লাহোর এলে জনগণ কালো পতাকা দেখায়, সেখানে পুলিশ নির্মম ভাবে লাঠচার্জ করে লালা লাজপত রায় মারাত্মক ভাবে আহত হন ও ১৯শে নভেম্বর শহীদ হন। ক্রোধের আগুনে ঘি পড়লো, সবার মুখে একটাই প্রশ্ন আমরা কি এতটাই অসহায়, যে জাতির সম্মান রক্ষা করতে পারছি না? লালাজি জীবনের শেষের দিকে বিপ্লবী দের সম্পর্কে বিরক্তি প্রকাশ করতেন। ভগৎ সিং ও সুখদেবের জন্য তার বাড়ীর দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিলেন, শেষের দিকে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির সঙ্গ নিতে শুরু করে ছিলেন। তার পরও HSRA সভায় ঠিক হয় লালাজির উপর প্রহর মানে জাতির উপর প্রহার তাই এখন মূল কাজ হলো এই হত্যার বিচার যা ইংরেজ আদালতে সম্ভব নয়। সাণ্ডর্স সাহেবকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেওয়া হলো। এই ঘটনার বিবরণ দিয়ে ইংরেজিতে ইশতেহার বিলি করা হয়, দেয়ালে পোস্টার মারা হয় শহর জুড়ে। সাণ্ডর্স কে হত্যা করা হবে এর প্রস্তাব দেন ভগৎ সিং, কিন্ত হত্যার পর দিন থেকে তার মন উদ্বেল হয়ে রইলো। বিপ্লবী হলেও রক্ত পিপাসু সে ছিল না। তার উদ্দেশ্য ছিল গোটা মানব জাতির সুখী করা। বিপ্লবী রা খুনি নয়, মানবতার পূজারী সেই জন্য মানুষের প্রাণ নিতে স্বভাবতই তাদের দুঃখ হয়। এই প্রসঙ্গে দলের পক্ষ থেকে দিল্লির অ্যাসেম্বলিতে যে ইশতেহার ছড়ানো হয়, তাতে বলা হয়েছিল: "মানুষের জীবন আমরা পবিত্র বলে মনে করি। এমন এক উজ্বল ভবিষ্যতের আমরা বিশ্বাস রাখি যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি পূর্ন শান্তি ও স্বাধীনতার সুযোগ পেতে পারে। মানুষের রক্ত ঝরাতে বাধ্য হই বলে আমরা দুঃখিত। তবে বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে সকলকে সমান স্বাধীনতা দিতে, মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ শেষ করতে, বিপ্লবে কিছু না কিছু রক্তপাত অনিবার্য" সাণ্ডর্সহত্যার পর পুলিশ ভগৎ কে হন্যে হয়ে খুঁজছিল, তখন পুলিশের চোখে ধুল দিয়ে রাজগুরু ও ভগৎ সিং কলকাতায় চলে আসেন, এখানে সাক্ষাৎ হয় যতীন দাশের সঙ্গে, যতীন দাস বোমা তৈরি তে পারদর্শী ছিলেন, ভগৎ সিং আগ্রা তে এসে তার সাথীদের বোমা তৈরি শিখিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। বোমা তৈরির আরও একটা বাধা তাদের থেকে দূর হলো তখন। এই সময় কমিউনিস্ট দের নেতৃত্ব শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত হছিল, শ্রমিকদের এই এই আন্দোলন অঙ্কুরে শেষ করার জন্য কেন্দ্রীয় বিধান সভায় ট্রেড ডিসপ্যুট বিল ও পাবলিক সেফটি বিল আনা হয়। গোটা দেশ জুড়ে সব রাজনৈতিক দল ও দেশবাসী একসুরে এর বিরোধিতা করতে থাকে। ভগৎ সিং কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক ডাকে, ঠিক হয় এর বিরোধিতা করতে হবে। কিন্তু সরকার যদি কালা হয় তাকে শোনানোর জন্য জোরে আওয়াজ এর প্রয়জন তাই ঠিক হয় বোমা নিক্ষেপ করে গ্যালারি থেকে ইশতেহার বিলি হবে আর বয়রাদের কান খোলা হবে। জয়দেব কে দায়িত্ব দেওয়া হয়, অ্যাসেম্বলি ভবন (এখন লোকসভা) এর নস্কা তৈরি করা, পরে সে ভগৎ সিং কে বুঝিয়ে দেবে ১৯২৯ সালের ৮ই এপ্রিল ভগৎ সিং ও বটুকেস্বর দত্ত বোমা নিক্ষেপ করে, যদিও বোমা গুলি তে কোনো স্প্লিন্টার ছিল না যাতে কোন মানুষ মারা যান তার পর সেই বিখ্যাত ইশতেহার "বধির কে শোনাতে হলে জোরালো গলা চাই"। অসহায় ভারতীয় জনগনের হয় প্রতিবাদ করতে আমরা একটি শিক্ষার উপর জোর দিতে চাই; এই শিক্ষা ইতিহাসে বহুবার পুনরাবৃত্ত যে, ব্যক্তিকে সহজেই খুন করা যায় কিন্তু ধারনা কে খুন করা যায় না। বড় বড় সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে গেছে কিন্তু ধারনা গুলি কালোউত্তীর্ণ। ইনকিলাব জিন্দাবাদ বোমার মামলা চলাকালীন 'বিপ্লব'র স্বরূপ লিখতে গিয়ে লেখেন, "…অতএব একটা মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন এবং যারা এ কথা উপলব্ধি করেছে তাদেরই দায়িত্ব সমাজকে সমাজতান্ত্রিক ভিত্তির ওপরে পুনর্গঠিত করা।" তিনি বিপ্লব মানে ওই ব্যাখায় লিখেছিলেন, "বিপ্লব সর্বদা রক্তাক্ত সংঘাতে জড়িত নয় এবং তার মধ্যে ব্যক্তিগত প্রতিশোধেরও স্থান নেই। বিপ্লব মানে বোমা-পিস্তলের পূজা নয়। বিপ্লব বলতে আমরা বুঝি যে, বর্তমান ব্যবস্থা যা স্পষ্টতই অন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাকে পালটাতে হবে।" সংগ্রামের রণকৌশলের অপরিহার্য অঙ্গ জঙ্গি আন্দোলন কিন্তু সেই জঙ্গি আন্দোলনের স্বরূপ কেমন হবে তা তিনি দৃঢ়তার সাথে জানান দিয়ে গেছেন বারবার। বিপ্লবের সংজ্ঞায়নের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন অহেতুক হিংসাত্মক ভঙ্গিমা বা প্রতিশোধপরায়নতায় হত্যালীলা কোনো বৈপ্লবিক গঠনমূলক কর্মকাণ্ড না। রোমাঞ্চের তাগিদে অস্ত্র ধরলে স্বাধীনতা অধরাই থেকে যাবে। একমাত্র সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সংগঠিত গণআন্দোলনের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতা আস্বাদন করা সম্ভব। এই গণআন্দোলনের একাগ্রতাই হল তাঁর মতে জঙ্গি আন্দোলন। গণআন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আত্মত্যাগী মনোভাবে সর্বাত্মক নিয়োগই জঙ্গি আন্দোলনের রপ। কিন্তু তা বলে তিনি বর্তমান ব্যবস্থার উৎপাটনে সদা সর্বদা শান্তির ললিত বাণী শোনানোর দলে ছিলেন না। অহিংসতার বুলি তাঁর কাছে ছিল ফাঁকা আওয়াজ। ইউটোপিয়ো আখ্যা দিয়েছিলেন অহিংস মতবাদকে। তিনি জানতেন যখন শাসকের শ্রেণী স্বার্থ বিপদসঙ্কেত দেখতে পাবে, তখন তারা শক্তিপ্রয়োগ করবেই। তার মোকাবিলা করতে গেলে পাল্টা শক্তিপ্রয়োগ অপরিহার্য। এইচআরএ'র ইশতেহারে অনেক আগেই ঘোষনা ছিল, "এই সরকারি সন্ত্রাসবাদের জবাব অবশ্যই পালটা-সন্ত্রাসবাদ দিয়ে দিতে হবে।…….পার্টি কখনো ভুলবে না যে সন্ত্রাশবাদ তাদের লক্ষ্য নয়।" বধিরকে শোনাতে হলে উচ্চনাদ প্রয়োজন, তাই অহিংসাত্মক মিনমিন দিয়ে কাজ হবেনা। কেন আমি নাস্তিক
শ্রেণিচেতনাই প্রধান হাতিয়ার যা সহায় হতে পারে দাঙ্গা রুখতে ২৩শে মার্চ ১৯৩১ মানবতা কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিয়ম এর তোয়াক্কা না করে সন্ধ্যা বেলা ফাঁসি দেওয়া হয়, তার পরে দেহ গুল কে টুকরো টুকরো করে কেটে চটের বস্তায় ভরে শতদ্রু নদীর তীরে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। কারণ ভগৎ সিং এর বিখ্যাত কথা "জীবিত ভগৎ সিং এর থেকে মৃত ভগৎ সিং ব্রিটিশ শোষক দের কাছে আরো বেশি বিপদজনক হবে"। প্রকাশের তারিখ: ২২-মার্চ-২০২৪ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|