|
আজাদ হিন্দ ফৌজ, সুভাষচন্দ্র বসু এবং কমিউনিস্ট পার্টিSoumyadeep Raha |
রশিদ আলী দিবসের এই আন্দোলনে কমিউনিস্টদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে আন্দোলনটি কেবল ছাত্রদের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি ব্যাপক গণ-আন্দোলনের রূপ নেয়। এর মাত্র কয়েকদিন পরেই শুরু হয় ঐতিহাসিক নৌবিদ্রোহে (Royal Indian Navy Mutiny)। |
| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় থেকে সুভাষচন্দ্র বসু ও বামপন্থী সহ কমিউনিস্টদের মধ্যে এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে । ১৯৩৯ সালে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী শক্তিগুলোকে একত্রিত করতে নেতাজি যখন 'লেফট কনসোলিডেশন কমিটি' (LCC) গঠন করেন, তখন কমিউনিস্টরা তাতে শামিল হয়। ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে নেতাজি যখন কলকাতায় গৃহবন্দী অবস্থা থেকে ছদ্মবেশে পালিয়ে যান , তখন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বেশ কয়েকজন সদস্য তাঁকে সীমান্ত পার হতে এবং আফগানিস্তান হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে পৌঁছানোর গোপন যাত্রায় সরাসরি সাহায্য করেছিলেন। এই কাজে আচ্চহার সিং ছিনা (Soviet-দের কাছে 'লারকিন' নামে পরিচিত) এবং কমরেড ভগত রাম তলোয়ারের মতো কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এরপর ১৯৪২ সালে টোকিও ও ব্যাংকক সম্মেলনে রাসবিহারী বসুর উদ্যোগে প্রথম আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠিত হয়। ১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে সিঙ্গাপুরে রাসবিহারী বসু আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব সুভাষচন্দ্র বসুর হাতে তুলে দেন। ১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু 'আর্জি হুকুমত-এ-আজাদ হিন্দ' বা স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার গঠন করেন এবং তিনি এর প্রধান নির্বাচিত হন । এই সরকারকে জাপান, জার্মানি ও ইতালি সহ তৎকালীন অক্ষশক্তির দেশগুলো স্বীকৃতি দেয়। এই বাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল জাপানি বাহিনীর সহযোগিতায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভারতকে সশস্ত্র উপায়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা। যার ফলস্বরূপ আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যরা আরাকান, সিনজেওয়ার, ইম্ফল, কোহিমা, বার্মা (মিয়ানমার), পোকোকু, মেইক্তিলা ও ম্যানডালে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র যুদ্ধ করেন। অবশেষে ১৯৪৪ সালের মার্চ মাসে আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে এবং ত্রুয়া ও কোহিমায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। জাপান এই দ্বীপগুলো আজাদ হিন্দ সরকারের হাতে তুলে দেয়। নেতাজি এগুলোর নাম রাখেন 'শহীদ' ও 'স্বরাজ'দ্বীপ। যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিকভাবে পরাজয় ঘটলেও (১৯৪৫ সালে জাপানের আত্মসমর্পণের পর), আজাদ হিন্দ ফৌজের অবদান ভারতের ব্রিটিশ শাসনের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। ১৯৪৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪৬ সালের মে মাস পর্যন্ত দিল্লির লাল কেল্লায় আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দি সেনা ও অফিসারদের যে বিচার হয়, তার বিরুদ্ধে সমগ্র ভারতজুড়ে গণআন্দোলন ও বিদ্রোহ শুরু হয়। আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন আবদুল রশিদ আলীকে ব্রিটিশ সামরিক আদালত ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিলে ১৯৪৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় ছাত্র আন্দোলন ফেটে পড়ে। মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন এই আন্দোলনের ডাক দিলেও কমিউনিস্টদের ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র ফেডারেশন’ (BPSF) তাতে পূর্ণ সমর্থন জানায় এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যখন দিল্লির লালকেল্লায় আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদের বিচার শুরু হয় এবং ১৯৪৬ সালে রাজকীয় ভারতীয় নৌবাহিনীতে (Royal Indian Navy Mutiny) বিদ্রোহ ঘটে, তখন কমিউনিস্টরা সক্রিয়ভাবে রাস্তায় নেমে আসে। বোম্বাই ও কলকাতায় আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দীদের মুক্তির দাবিতে এবং নৌবিদ্রোহীদের সমর্থনে কমিউনিস্টরা বিশাল সাধারণ ধর্মঘট ও গণবিক্ষোভের নেতৃত্ব দেয়, যা ব্রিটিশদের কাছে একটা চূড়ান্ত ধাক্কা ছিল। ১৯৪৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় "রশিদ আলী দিবস" পালিত হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় ওয়েলিংটন স্কোয়ারে এক ঐতিহাসিক সমাবেশ ঘটে, যেখানে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI), কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পতাকা একসাথে উড়তে দেখা যায়। ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি রশিদ আলীর মুক্তির দাবিতে এবং পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে যে অভূতপূর্ব সাধারণ ধর্মঘট ও হরতাল পালিত হয়, তার পেছনে কমিউনিস্টদের অবদান ছিল সর্বাধিক। রশিদ আলী দিবসের এই আন্দোলনে কমিউনিস্টদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে আন্দোলনটি কেবল ছাত্রদের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি ব্যাপক গণ-আন্দোলনের রূপ নেয় । এর মাত্র কয়েকদিন পরেই শুরু হয় ঐতিহাসিক নৌবিদ্রোহে (Royal Indian Navy Mutiny) । এই আজাদ হিন্দ বাহিনীর উল্লেখযোগ্য কমান্ডাররা ছিলেন মেজর জেনারেল মুহাম্মদ জামান কিয়ানি , মেজর জেনারেল শাহ নওয়াজ খান , কর্নেল প্রেম সেহ্গাল , কর্নেল শওকত মালিক প্রমুখ । পরিশেষে বলা যায়, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। সামরিক ক্ষেত্রে সাফল্য সীমাবদ্ধ থাকলেও, তাঁদের এই সশস্ত্র বিপ্লব ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ভারতের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে উল্ল্যেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে ছিল । তবে এই প্রসঙ্গে তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকার বিষয়টিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাসের এক সংকটময় মুহূর্তে দেশপ্রেমের তাড়নায় এই দুই ধারা এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছিল। যখন লাল কেল্লায় আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দি সেনাদের বিচার শুরু হয়, তখন কমিউনিস্ট পার্টিসহ সর্বস্তরের ভারতবাসী সমস্ত রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত ভেদাভেদ ভুলে তাঁদের মুক্তির দাবিতে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। এই গণ আন্দোলন এবং নৌ-সেনা বিদ্রোহই ব্রিটিশদের কাঁপন ধরিয়েছিল । প্রকাশের তারিখ: ২৩-অক্টোবর-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|