‘জনগণমন’ অপসারণের উদ্যোগ ?

Dr. Pabitra Sarkar
বঙ্কিমের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে লড়িয়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে খাটো করার এই চেষ্টা—নির্বাচনের বছরে বাঙালি ভালো মনে নেবে কি ?  ভারতীয় জনতা পার্টির বাঙালি নেতানেত্রী আর সদস্যরা কী মনে করেন ?  মনে হয় ব্যাপারটা তাঁরা বোঝেন ও জানেন।   তবু তাঁরা হিন্দুত্বের গোঁ ছাড়বেন না।  ও পারে নির্বাচনে জামাতি জেহাদিদের দেখেও তো তাঁদের একটু হুঁশ হওয়া দরকার।
মধ্যমেধা বা নিম্নমেধা হওয়া কোনও অপরাধ নয়।  কিন্তু ভারত শাসনকারী একটি প্রবল প্রতাপ রাজনৈতিক দলের মধ্যে যখন মধ্য বা আরও খারাপ মেধার বিপুল সংক্রমণ দেখি তখন ভাবি তা তো দেশের মানুষকেও ওই অন্ধকার মধ্য মেধার দ্বার আচ্ছন্ন করবে, তার হাত থেকে দেশকে বাঁচাবো কোন পথে ?  এই দল প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান-প্রণালীর অংশ মহাকবি কালিদাসের মহাকবিত্বের কোনও খবর রাখে কি না জানি না, কিন্তু তার যৌবনকালের মহামূর্খতাকে অনুসরণ করতে বদ্ধপরিকর।  কালিদাস যেমন গাছের যে ডালে বসেছিলেন সেই ডালেরই গোড়া কাটতে উদ্যোগী হয়েছিলেন, এরাও সেই রকম সংকল্প নিয়েছে।  পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-এর নির্বাচনের আগে ‘বাঙালিদের’ ‘খুশি’ করবার জন্য শুধু বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম্’ গানের দেড়শো বছর ধুমধাম করে উদ্‌যাপন করে খুশি হয়নি, এবার তাকে জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’ গাওয়ার আগে গাইতেই হবে ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ড ধরে।  বাপ রে, এতক্ষণ ধরে, তার ছটি স্তবকই !  আর তার ‘পরে’ ‘জনগণমন’ মাত্র একটি স্তবক, মোট ৫২ সেকেন্ড গাওয়া হয়-- শুরু হতে-না-হতেই শেষ হয়ে যাবে।  মধ্যমেধা, নিম্নমেধার প্রশ্ন ছাড়িয়ে আর-একটা সম্ভাবনাও মনে উঁকি দিচ্ছে।  এর মধ্যে কোনও প্রতারণার ষড়যন্ত্র নেই তো ?  ‘জনগণমন’কে আলগোছে, পরের ধাপে জাতীয় সংগীতের অবস্থান থেকে সরিয়ে দেবার উদ্যোগ ?  একবার ভাবি, এদের কি সেই সাহস হবে ?  তা হলে বাঙালিকে ‘খুশি’ করার প্রকল্পের সঙ্গে তার একটা ঝগড়া শুরু হয়ে যাবে না ?  কী জানি !  মধ্য-নিম্নমেধা আর বিশুদ্ধ শয়তানি কোথায় আত্মীয়তার সূত্রে বাঁধা পড়ে তা বুঝে ফেলা আমাদের মতো লোকের সাধ্য নয়।  আমরা কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটের এই নির্দেশের মধ্যে একটা সুচতুর পরিকল্পনা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের অনুমান ভুল হলে আমরা সুখী হবো।
প্রথমত ‘আগে’ আর ‘পরে’ একটা মানদণ্ড, যাতে সাধারণ লজিকে মনে হতে পারে প্রথমটাই প্রধান, দ্বিতীয়টা একটু এলেবেলে।  আর দ্বিতীয়ত, প্রথমটা বেশি সময় ধরে গাইতে হবে, দ্বিতীয়টা তার প্রায় ছ’ভাগের এক ভাগ সময়, তাতেও বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা যে, দ্যাখো, আমাদের কাছে প্রথমটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, দ্বিতীয়টা তত নয়।  এই ব্যবস্থায় আরব্য উপন্যাসের সিন্দবাদের কাঁধে দৈত্য জাতীয় তুলনা মনে আসে, কিন্তু আমি তা ব্যবহার করতে চাই না।

চাই না, কারণ ‘বন্দে মাতরমে’র গৌরব আর মহিমা সম্বন্ধে আমি শ্রদ্ধাশীল।  তা ভারতের প্রথম দেশপ্রেমের গান নয় (রবীন্দ্রনাথের মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মিলে সবে ভারত সন্তান, একতান, মনপ্রাণ—গাও ভারতের যশোগান’ তার আগে লেখা হয়েছে), কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম্’ গান আর ‘স্লোগান-এর যে ভূমিকা সে ভূমিকা অন্য কোনও গানের নেই।  

এটা একটু আশ্চর্যের কথাও বটে।  তার কারণ, ‘বন্দে মাতরম্’ মোটেই ভারতের স্বাধীনতার গান ছিল না আদিতে।  তা ছিল বঙ্গভূমির বা বাংলার স্বাধীনতা হরণে বিষাদ আর উজ্জীবনের গান।  বঙ্কিমচন্দ্র বখতিয়ার খিলজির বাংলা জয় নিয়ে যত মর্মাহত ছিলেন, ভারতের স্বাধীনতা-বিলোপ নিয়ে তত বিষণ্ণ ছিলেন না এই কথাটা এমনভাবে বলা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু ‘মৃণালিনী’ (১৮৬৯), ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২), ‘সীতারাম’ (১৮৮৭) ইত্যাদিতে তাঁর আখ্যানগুলি মূলত বাংলা কেন্দ্রিক স্বদেশ প্রেমের গল্প।  সেখানে শত্রু  ইংরেজ নয়, বহিরাগত মুসলমান বিজেতারা, যদিও দেশে তখন ইংরেজেরই রাজত্ব।  তাই ‘বন্দে মাতরম্’-এ প্রথমে ছিল ‘সপ্তকোটি কণ্ঠ মুখরিত নিনাদ করালে, দ্বি-সপ্তকোটি হস্তধৃত খরকরবালে, অবলা, কেন মা এত বলে ?’ পরে তা কার হাতে ঠিক জানা নেই, ‘ত্রিংশ কোটি’ ‘দ্বাত্রিংশ কোটি হস্ত’ হয়, আর রবীন্দ্রনাথের দেওয়া ‘দেশ রাগিণীর সুরে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।  তার যে শতাধিক সুর পাওয়া গেছে তাতেই এই গানের প্রভাব ও জনপ্রিয়তা প্রমাণিত হয়।  বিপ্লবীরা বন্দে মাতরম্ বলে ফাঁসিকাষ্ঠে জীবন দিয়েছেন, অন্যান্য প্রচুর ভারতীয় গানে ‘বন্দে মাতরম্’ কথাদুটি ধুয়ো হিসাবে জুড়ে গেছে (রবীন্দ্রনাথের ‘এক সূত্রে বাঁধিয়াছি’ ইত্যাদি দৃষ্টান্ত), তাই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এ গানের মহিমা কোনোভাবেই ছোট করে দেখা সম্ভব নয়।
তবু ‘বন্দে মাতরম্ যে কারণে প্রথমে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে (১৯৩৭) আর ভারতীয় সংবিধানে (১৯৫০) ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গৃহীত হয়নি তার কারণগুলি এখনও বর্তমান, সেগুলিকে অস্বীকার করার কী অজুহাত তৈরি হলো তা আমরা জানি না।  প্রথমত, এই গানটিতে যেহেতু হিন্দু দেবী দুর্গার বর্ণনা আর দেশমাতার বর্ণনা এক সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন বঙ্কিম (একটু আগে লেখা ‘কমলাকান্ত’-এর “আমার দুর্গোৎসব”-এও তাই আছে, তা অহিন্দু কোনও সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।  অন্য সম্প্রদায়গুলির কাছ থেকে আপত্তি এসেছিল, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ চেয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ প্রথম দুটি স্তবক রেখে (‘সুখদাং বরদাং মাতরম্’) পর্যন্ত রেখে গাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।  নিজের কোনও গান সম্বন্ধে কোনও ওকালতি করেননি।  এ কথাও আমরা বলছি না যে, হিন্দু কবি বা লেখক তাঁর কবিতা বা গানে তাঁদের দেবদেবীকে বর্ণনা বা অলঙ্কার হিসাবে ব্যবহার করবেন না।  সে অধিকার তাঁদের বৈধ অধিকার।  কিন্তু দেশের নানা ধর্মের পাঠক তাকে কীভাবে গ্রহণ করবেন, সকলে নিছক সাহিত্য হিসাবে নেবেন কি না, সে প্রশ্ন উঠেই পড়ে।  কারণ জাতীয় সঙ্গীত একটি জাতীয় ‘প্রতীক’, জাতীয় পতাকারই মতো।  তার সঙ্গে কোনও একটি ধর্মের চিহ্ন লেগে থাকা উচিত নয়।  তাই ভেবেই শেষ পর্যন্ত ভারতের সংবিধান ‘জনগণমন’-র প্রথম স্তবকটিকেই জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গ্রহণ করে আর তা আন্তর্জাতিকভাবে পৃথিবীর এক শ্রেষ্ট জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গণ্য হয়।  আমরা লোকসঙ্গীত গায়ক পিট সিগারের মুখে এই গান শুনেছি এবং তার প্রশংসা শুনেছি।

দ্বিতীয় কারণ বোধ হয় ছিল ‘বন্দেমাতরম্’-এর তখনকার প্রচলিত দেশ রাগনির্ভর কঠিন সুর—তা সমবেত কণ্ঠে গাওয়ার উপযোগী ছিল না। পরে অবশ্য তার সুরকে মিলিটারি ব্যান্ডের যোগ্য করে তালে ফেলা হয়।  এবং রবিশঙ্কর আর আরও অনেকের নিয়মিত তালযুক্ত সুর সংযোগ করেন।  তবু ‘জনগণমন’র মতো সহজ সুর তার হয়নি।
আর বন্দেমাতরম্ পুরো গানটিতে দেশকে ভক্তি গদগদচিত্তে দেবীরূপে বন্দনা করা হয়েছে বটে, কিন্তু তার মধ্য একটু মিলিটারি-মিলিটারি ভাবও আছে।  তাঁর হাতে ধরা শাণিত তরোয়াল, শত্রুদলকে আটকে দেওয়া বীরত্ব ইত্যাদি অন্যদের ভয় দেখানো কথাবার্তা আছে, যেন আমরা ধরেই নিচ্ছি যে, দেশ হলেই শত্রু থাকবে।  এবং গানের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদীদের মতো সেটা লিখে দিতে হবে।  তার জায়গায় ‘জনগণমন’ ভারতের সহস্র বৎসরের সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মিলিত আত্মবিকাশের কথা আছে, আমার ক্ষুদ্র মতো তা অনেক বেশি গভীর।
আমাদের প্রশ্ন, ভারত কি এখন পুরোপুরি হিন্দু রাষ্ট্র হয়ে গেছে ?  না অচিরে হবার কোনও সম্ভাবনা আছে ?  আর এই নির্দেশের ব্যাপ্তি আমি ঠিক জানি না—তা কি সমস্ত ভারতীয় নাগরিককেই—হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান—কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী আর গুজরাট থেকে অরুণাচল প্রদেশ--বাধ্যতামূলকভাবে গাইতেই হবে—তাঁদের ধর্মের সংস্কার ও বিশ্বাসকে অস্বীকার বা উল্লঙ্ঘন করে ?  তা হলে এটা কিছুটা জুলুমের মতো হয়ে যাচ্ছে না কি ? এই সব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর কি ভারতীয় মন্ত্রীসভার কাছে আছে ?  যেখানে ভারতের নাগরিকদের মধ্যে সমস্ত ধর্মের মানুষ রয়েছেন সেখানে অন্যদের মতামত কি আমন্ত্রণ করা হয়েছিল ?  নাকি সংসদে বিষয়টা ফেলা হয়েছিল আলোচনার জন্য ?
আর আমার শেষ কথা—এই নির্দেশ এ বছর নির্বাচনের আগে ‘বাঙালি’দের খুশি করবে, আমাদের জাতীয় সঙ্গীতকে (আর কারও নয়, রবীন্দ্রনাথ রচিত) এই ভাবে গৌণ ও প্রায় অবমানিত করে তোলার জন্য, তা হলে কর্তারা কীসের স্বর্গে বাস করছেন তাঁরাই ভালো বুঝবেন।  বঙ্কিমের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে লড়িয়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে খাটো করার এই চেষ্টা—নির্বাচনের বছরে বাঙালি ভালো মনে নেবে কি ?  ভারতীয় জনতা পার্টির বাঙালি নেতানেত্রী আর সদস্যরা কী মনে করেন ?  মনে হয় ব্যাপারটা তাঁরা বোঝেন ও জানেন।   তবু তাঁরা হিন্দুত্বের গোঁ ছাড়বেন না।  ও পারে নির্বাচনে জামাতি জেহাদিদের দেখেও তো তাঁদের একটু হুঁশ হওয়া দরকার।

গণশক্তি পত্রিকায় প্রকাশিত
প্রকাশের তারিখ: ১৭-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org