|
নদী ঘেরা ৯ দ্বীপ - মৃণাল চক্রবর্তীMrinal Chakraborti |
|
সন্দেশখালি : এক প্রতিরোধের চিত্রনাট্য সন্দেশখালিতেই নজর রাজ্য, বলা যায় গোটা দেশেরও। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সুন্দরবন অঞ্চলে প্রত্যন্ত এলাকার নয়টি দ্বীপাঞ্চল নিয়ে গঠিত এই সন্দেশখালি। দু’টি ব্লকে বিভক্ত এই অঞ্চলে ১৬টি গ্রাম পঞ্চায়েত। ২০১১ সালের আদমসুমারী অনুযায়ী জনসংখ্যা ৩,২৫,৪৪১- যার মধ্যে তফশিলি জাতি ও উপজাতির মানুষ প্রায় ৬৩ শতাংশ। ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রায় ২৭ শতাংশ। ১৬টি গ্রাম পঞ্চায়েতের ৬টি মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত। বাকি ১০টি অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম মূলত নৌকা ও ফেরি পরিষেবা। স্বাধীনতার আগে জোতদার জমিদারদের অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে ১৯৪৬ সাল থেকে সন্দেশখালির মানুষ অংশগ্রহণ করে তেভাগার লড়াইয়ে। জোতদারের লেঠেল বাহিনীর হাতে রাতের অন্ধকারে খুন হন সন্দেশখালির প্রথম শহীদ আলতাপ মোল্লা, যার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েই এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রয়াত হেমন্ত ঘোষাল। পরবর্তীতে বেড়মজুড়ে কাছারি বাড়িতে নিজেদের ন্যায্য দাবী আদায়ের লড়াইয়ে লেঠেল বাহিনীর হাতে শহীদ হন রবিরাম, রথিরাম, চামু বিশাল ও পাগলু। তেভাগার লড়াইয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে ক্ষুদিরাম ভট্টাচার্য, শরৎ সর্দার, বরুণ পাত্র, প্রবীর মণ্ডল ও থুপা সর্দারের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে সন্দেশখালির মানুষের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন সুবোধ দে, কুমুদ বিশ্বাস, ধীরেন মণ্ডল, কান্তি বিশ্বাস, অবনী রায় থেকে আজকের নিরাপদ সর্দাররা। ১৯৫২ সালে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম সাধারণ নির্বাচনে তৎকালীন হাড়োয়া কেন্দ্র থেকে (সন্দেশখালি অন্তর্ভুক্ত ছিল) নির্বাচিত হন তেভাগার লড়াইয়ের সেনাপতি হেমন্ত ঘোষাল। পরবর্তীতে ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালের নির্বাচনে বামপন্থী প্রার্থীরা জয়ী হয় সন্দেশখালি কেন্দ্র থেকে। পরবর্তীতে ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে সিপিআই(এম) প্রার্থীরাই জয়ী হন। ![]() ১৯৭৭ এর আগে এই দুর্গম সন্দেশখালিতে ছিল তীব্র দারিদ্র, অশিক্ষা, অনুন্নয়ন, পানীয় জলের সঙ্কট, বেহাল স্বাস্থ্য পরিষেবা ও শিক্ষার অভাব- সর্বোপরি বেহাল অর্থনৈতিক দশা। ১৯৭৭ পরবর্তী সময়ে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে কৃষকসভার নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগে বঞ্চিত নিপীড়িত ৭হাজার বর্গাদারের নাম নথিভুক্ত করা হয় এবং তাদের জমির অধিকার দেওয়া হয়। পাট্টার মাধ্যমে ২৬ হাজার পরিবারকে ২৪ হাজার বিঘা জমি বণ্টনের মধ্যে দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার সূচনা হয় সেই সময় থেকেই। গড়ে ওঠে যোগাযোগ ব্যবস্থা, জেটি নির্মাণ, কাঁচা রাস্তাকে পাকা রাস্তায় উন্নীত করা, বিদ্যুতায়ন, শিক্ষা সংস্কৃতির প্রসার- যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উন্নীত করা, অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসকে, এমএসকে তৈরী করা। ১৯৮৫ সালের ১ মে কালিনগর মহাবিদ্যালয় গড়ে তোলা সহ সেচ, নিকাশি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানো, হাজার হাজার কিলোমিটার মজা খাল সংস্কার, বাঁধ নির্মাণ ইত্যাদি। সন্দেশখালির মানুষের মূল পেশা ছিল কৃষি। মিষ্টি জলাধার বানিয়ে বৃষ্টির জল ধরে রেখে জমিকে দোফসলি করার চেষ্টা ছিল অবিরাম। এর পাশাপাশি মজা খাল সহ খালগুলিকে সংস্কার করে নিকাশি ও চাষের কাজে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয় সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদ ও পঞ্চায়েতি ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে। এতদসত্ত্বেও বেশিরভাগ জমি এক ফসলী এবং অলাভজনক থেকে যাওয়ায় এক সময়ে চিংড়ি রপ্তানি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হলো।ব্যবসায়ীরা প্রলুব্ধ করল কৃষকদের। উৎসাহিত করল মাছ চাষে জমি লিজ দেওয়ার জন্য। বৃষ্টির জলে চাষ করে বিঘা প্রতি যে আয় হতো কৃষকের তার চার পাঁচ গুণ টাকা মাছ চাষে বিঘা প্রতি কৃষকদের দেওয়া হতো। এভাবে ব্যবসায়ীরা অধিকাংশ কৃষকের সম্মতি আদায় করতেন জমি মাছ চাষে লিজ দেওয়ার জন্য। এরপরে সম্মত কৃষকদের সহযোগিতায় অসম্মত কৃষকদের বুঝিয়ে রাজী করিয়ে গড়ে ওঠে ফিসারি বা মেছোঘেরি। ধীরে ধীরে গ্রামীণ আর্থসামাজিক নিয়ন্ত্রণে বাড়তে থাকে এদের প্রভাব ও ভূমিকা।এতদসত্ত্বেও মাছ চাষে বিঘা প্রতি লিজের হার নির্ধারিত হতো জমির মালিকদের মধ্যে থেকে গড়ে ওঠা কমিটির ব্যবস্থাপনায় প্রকাশ্য নিলামের মধ্যে দিয়ে। লিজের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে ফের ওই একই ব্যবস্থার মাধ্যমে মালিক নির্দিষ্ট হতো এবং লিজের পরিমাণ বাজার অনুযায়ী বৃদ্ধি পেত। কৃষকরা চুক্তি অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য নিয়মিত বুঝে পেত। চুক্তি অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য পেতে কোনও অসুবিধা হলে পঞ্চায়েত এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কৃষকের স্বার্থ রক্ষিত হতো। সামগ্রিক ভাবে গ্রামের অর্থনীতি শক্তিশালী হয় এবং শান্তি ও সুস্থিতির মধ্যে দিয়ে মানুষ তার জীবনজীবিকা নির্বাহ করতে থাকে। এই সময়ে বামফ্রন্ট সরকারের নেতৃত্বেই ১০০দিনের কাজ, মিড ডে মিল, আই সি ডি এস সেন্টার গড়ে তুলে মা ও শিশুর পুষ্টির ব্যবস্থা করা, বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা, কৃষি পেনশন, মৎসজীবীদের দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ সহ বিভিন্ন প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে রূপায়িত হয়। বয়স্ক আদিবাসীদের পেনশন, সংখ্যালঘু, তফশিলি জাতি উপজাতি ছাত্র-ছাত্রীদের ভাতা সহ আবাসিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়। পাইপ লাইনের মাধ্যমে আর্সেনিক মুক্ত পরিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ করা হয়। এ সমস্ত পরিষেবাগুলি তৎকালীন সময়ে নির্দিষ্ট ভাবে পৌঁছে যেত প্রান্তিক মানুষের কাছে। ![]() ২০০৬ পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিক ভাবে বামবিরোধী এবং সরকারবিরোধী শক্তি এবং তথাকথিত পরিবর্তনকামী বুদ্ধিজীবীদের সহযোগিতায় ২০১১সালে সরকার বদল হয়। সেই সময়েও সন্দেশখালির মানুষ বামপন্থী প্রার্থী নিরাপদ সর্দারকে জয়ী করেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সন্দেশখালির জলকর মালিক, ইটভাটার মালিক এবং তাদের সম্পদের পাহারাদার সমাজবিরোধীরা তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে যুক্ত হয়ে সন্দেশখালির রাজনৈতিক জমি দখলে উদ্যোগী হয়। এতদসত্ত্বেও ২০১৩ ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী নামিয়েও বসিরহাট মহকুমা ও সন্দেশখালির ফলাফল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে খুব স্বস্তিদায়ক হয়নি। মহকুমার ২৫টি জেলা পরিষদ আসনের মধ্যে ১৬টি আসন এবং ১০টি পঞ্চায়েত সমিতির মধ্যে ৫টি এবং ৯০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে ৪৭টিতে বামপন্থীরা গরিষ্ঠতা পেয়েও পুলিশের সহযোগিতা জয়ী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হামলা এবং কিডন্যাপ করা ইত্যাদি ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করে ৪টি পঞ্চায়েত সমিতি এবং ৪৩টি গ্রাম পঞ্চায়েতে বামফ্রন্টের বোর্ড গঠিত হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় পুলিশ প্রশাসনের মদতে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীবাহিনীর পরিকল্পিত আক্রমণ। নির্বাচিত হওয়ার ৭দিনের মধ্যে খুন হন হাসনাবাদ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম। এরপর থেকেই শুরু হয় পঞ্চায়েত ভেঙে দেওয়ার লক্ষে দলত্যাগে বাধ্য করিয়ে তৃণমূল বেশিরভাগ পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতি দখল করার পর ২০১৬ সালে ভোট লুটের মধ্যে দিয়ে সন্দেশখালি বিধানসভায় তৃণমূল জয়ী হয়। এই নিবার্চনে বামফ্রন্ট সমর্থিত সিপিআই(এম)’র নিরাপদ সর্দার ৩১শতাংশ ভোট পায়। দ্বিতীয়বার তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সমাজবিরোধীরা শেখ শাহজাহানের নেতৃত্বে সন্দেশখালির রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। এই বাহিনী শুরুতে মাছচাষের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার কাজ শুরু করে। প্রকাশ্য নিলামের ব্যবস্থাকে বাতিল করে হাজার হাজার বিঘার লিজ কি হবে এবং কে মাছচাষের অধিকার পাবে তা তারাই ঠিক করে দিতে শুরু করে। এই বাহিনী এই সুযোগে মালিকদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে কৃষকদের লিজমানি কম দিয়ে কাটমানি বাবদ বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করতে শুরু করে। ২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনের পর পঞ্চায়েতগুলি জবরদখল করা এবং ২০১৮ সালে বিরোধী রাজনৈতিক দলকে ভোটে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার মধ্যে দিয়ে পঞ্চায়েত দখল করে গ্রামোন্নয়নে সরকারি বরাদ্দ ও মানুষের অর্থ লুট করে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে। একদিকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক তারাই বর্তমানে মেছো ঘেরির মালিক হয়ে রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। এদের মধ্যেই কেউ জেলা পরিষদ সদস্য, কেউ জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ, কেউ পঞ্চায়েত প্রধান বা কেউ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সহসভাপতি এবং কর্মাধ্যক্ষের পদ অলঙ্কৃত করছেন। এদেরই কয়েকজন- শেখ শাহজাহান, শিবু হাজরা, উত্তম সর্দাররা। হাজার হাজার বিঘা মেছোঘেরির মালিক হয়ে উঠে এরাই জমি লিজের টাকা না দেওয়া, বলপূর্বক জলের দামে রায়ত সম্পত্তি কিনে নেওয়া, দখল করা, মাছ চাষের উদ্দেশ্যে অনিচ্ছুক কৃষকের চাষের জমিতে জোরকরে নোনা জল ঢুকিয়ে দেওয়া, বিনা পারিশ্রমিকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা, ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর পূর্বক মিছিল মিটিং এ যেতে বাধ্য করা, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করা, তাদের বাড়ি ঘর ভাঙচুর করার মতো ঘটনা রোজ ঘটিয়ে চলেছেন। ![]()
![]()
![]() প্রকাশের তারিখ: ১৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৪ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|