|
দেশ বাঁচাতে ২৭ সেপ্টেম্বর সাধারণ ধর্মঘট সফল করুন ... অমিয় পাত্রUnknown |
| ১২ সেপ্টেম্বর ২১ (রবিবার) ২০০৩ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন এন ডি এ সরকার একটি মডেল আইনের খসড়া রাজ্যগুলির কাছে পাঠায়। কৃষি রাজ্য তালিকাভূক্ত বিষয়, তাই রাজ্য বিধান সভায় এই আইন পাশ করার কথা বলা হয়। মোদি সরকার ২০১৭ সালে পুনরায় রাজ্যগুলির কাছে মডেল আইন পাঠায় যেখানে নতুন করে ই-কমার্স এবং অনলাইন ট্রেডিং বিষয়টি যুক্ত করা হয়। বলা বাহুল্য আমাদের রাজ্যের সরকার ২০১৪ সালে বিরোধীদের যুক্তি উপেক্ষা করে, শুধু সংখ্যার জোরে কেন্দ্রের পাঠানো মডেল আইন পাশ করে দেয়। ২০১৭ সালেই কেন্দ্রের পরামর্শ মত ই-কমার্স এবং অনলাইন ট্রেডিং এর ব্যবস্থা চালু করে দেয়।গত ২৭ শে সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে কৃষক বধের যে আইন চালু হল তা এ রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী আগেই করেছেন। নতুন কৃষক বধের আইনের এই লোকদেখানো বিরোধীতা, প্রতিবাদ শুধু মানুষের চোখে ধুলো দেবার জন্য। আইনের বিরুদ্ধে কথা বলার কোন নৈতিক অধিকার তৃণমূল কংগ্রেসের নেই। ![]() সরকারি ফসল ক্রয়ের ব্যবস্থা ধ্বংস করার আইন- চালু ব্যবস্থায় ছিল কৃষক উৎপাদিত পণ্য মান্ডী, সরকার নিয়ন্ত্রিত বাজার, এ পি এম সি এবং বেসরকারি বাজারে বিক্রি করতেন। রাজ্যভেদে কিছু ইতর-বিশেষ থাকলেও বেশিরভাগ ছিল অভাবি বিক্রি। ফসল বিক্রি করতে হত ফড়েদের কাছে। ফলে সরকার ঘোষিত সহায়ক মূল্য পাওয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব ছিল না। সরকারি তথ্য বলছে মাত্র ৬% কৃষক সহায়ক মূল্য পেতেন সেটাও মূলত যেখানে এফ সি আই, নাফেড বা কনফেডের মতো সংস্থা বা রাজ্য সরকার নিয়োজিত এজেন্সি ফসল কেনে। নতুন আইনে কৃষক কে তার ফসল সরকারি ব্যবস্থাপনার বাইরে বেসরকারি বাজারে বিক্রি করতে বলা হচ্ছে। দরদাম ঠিক হবে ক্রেতা বিক্রেতার আলোচনার মাধ্যমে। এখানে এম এস পি মূল্য নির্দ্ধারনের ভিত্তি হবেনা। দাবি করা হচ্ছে নতুন কৃষি পণ্যের বিপনন ব্যবস্থা হবে ফড়ে বা মিডিলম্যান মুক্ত। কৃষক স্বাধীন হবে জেলা,রাজ্য, রাজ্যের বাইরে যে কোন বেসরকারি বাজারে ফসল বিক্রি করতে পারবে। এমনকি ই- কমার্স বা অনলাইন ট্রেডিং এর সু্যোগ নিয়ে ফসল বিক্রি করা যাবে। সরকারের এই দাবির সারবত্তা কতটা তা একটু খতিয়ে দেখা যাক।![]()
![]() ![]() চুক্তি চাষের আইনঃ এই আইনে চাষ হবে এক অসম চুক্তির ভিত্তিতে। কৃষককে ফসল চাষের পূর্বেই চুক্তি সম্পাদন করতে হবে বৃহৎ কোম্পানি বা কর্পোরেট সংস্থার সংগে। একজন মধ্যস্ততাকারি তৃতীয় পক্ষ বা ক্ষমতাবান ফড়ে (Aggregator) এই চুক্তিতে যুক্ত থাকবে। কি ফসলের চাষ হবে, কি জাতের বীজ ব্যবহৃত হবে, কি কি রাসায়নিক সার লাগবে, ফসলের দাম কি হবে, গুনমান কেমন হলে চুক্তিমতো দাম পাওয়া যাবে এসবই চাষের আগেই ঠিক হয়ে যাবে। সার,বীজ,কীটনাশক সহ সব কৃষি উপকরণ সরবরাহ করবে স্পনসর কোম্পানির পক্ষে মিডিলম্যান। শুধু তাই নয়, তারা যে দামে এই উপকরণ সরবরাহ করবে কৃষক সেই দামেই তা কিনতে বাধ্য থাকবে। উৎপাদিত ফসলের মান বা গ্রেড ঠিক করবে ক্রেতা এবং তার উপর ভিত্তি করে কৃষকের প্রাপ্য নির্ধারিত হবে। দরদামের প্রশ্নে বা চুক্তির শর্তঅনুযায়ী কাজ না হলে বিরোধ নিষ্পত্তি করবে সরকারের নিযুক্ত আমলা। কৃষক আদালতে যেতে পারবে না। এমনকি কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার বা এই দুই সরকারের নিযুক্ত আমলাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করা যাবে না। এই আইনের সুবাদে বৃহৎ ব্যবসায়ী বা কর্পোরেট সমস্ত কৃষি উপকরণের বিক্রয়, ফসল ক্রয়, সমস্ত প্রকারের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, সঞ্চয়, হিমঘর, পরিবহন এবং বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করবে। দেশের খাদ্য শৃঙ্খল বিদেশী সংস্থাগুলির নেতৃত্বে বড় পুঁজি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। সেখানে আত্মনির্ভরতা কোনও স্থান থাকবে না। আমাদের রাজ্যে চুক্তি চাষ আছে এবং ক্রমশ বাড়ছে। একজন কৃষক যার পরিবারের কেউ শ্রম দেয়না এবং মূলত অকৃষি ক্ষেত্রের আয় থেকেই পরিবার চলে তাদের মধ্যে জমি অন্য কৃষক কে চুক্তিতে চাষ করতে দেওয়ার প্রবনতা দেখা যাচ্ছে। খেতমজুর বা গরীব কৃষকরাই চুক্তি চাষি। এক্ষেত্রে একজন কৃষকের জমি অন্য কৃষক চাষ করে। প্রাকৃতিক কারণে ফসলের ক্ষতি হলে বীমা বা ত্রাণ বাবদ অর্থ চুক্তি চাষির বিনিয়োগে অংশীদারিত্ব থাকলেও তারা তা পায়না। বর্তমান আইনে এ সম্পর্কে কিছু বলা নেই। আসলে এই আইন একান্তভাবে কর্পোরেট স্বার্থে করা হয়েছে। চুক্তি হবে কর্পোরেট সংস্থার সঙ্গে ছাপোষা কৃষকের। কেনাবেচার ক্ষেত্রে দরাদরি করার এক অসম প্রক্রিয়া। কর্পোরেটদের চাহিদাই শেষ কথা। কোন জমিতে কি ফসলের চাষ হবে সে প্রশ্নে কৃষকের কোন স্বাধীনতা থাকবেনা। একটা সময় ছিল যখন ইংরেজ শাসন বাংলার কৃষকদের জবরদস্তি নীল চাষে বাধ্য করেছিল। এই দানবীয় আইন সেই নীল চাষের দিনগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়। এই আইনে চুক্তির ফাঁসে জড়িয়ে কৃষক সর্বশান্ত হবে। ধরা যাক পেপসি কোম্পানির সংগে চুক্তির ভিত্তিতে ৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করা হল। বীজ, সার সহ সমস্ত উপকরণ চড়া দামে পেপসি কোম্পানি থেকে কৃষক কিনতে বাধ্য হল। আলু ওঠার পর কোম্পানির দালাল আলুর গুনমান পরীক্ষা করে জানিয়ে দিল এই আলু তারা কিনবে না। এই বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার সুবিধা নেবে কর্পোরেট। দেশের প্রধানমন্ত্রী যেখানে কর্পোরেটের পক্ষে সেখানে কৃষকের চোখের জলের দাম কে দেবে?অত্যাবশকীয় পণ্য আইনের সংশোধন এই সংশোধনের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো দানা শস্য, ডাল, ভোজ্য তেল সহ তৈল বীজ,আলু এবং পেয়াজ অর্থাৎ মোট ২০ টি কৃষি ফসল এই আইনের আওতায় রাখা হবে না। এই পণ্য ক্রয় ও মজুতের ক্ষেত্রে কোন সীমা থাকবেনা। কোথায় এবং কত দামে বিক্রি করা হবে তা সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে না। এককথায় মজুতদারি ও কালোবাজারির ছাড়পত্র দেওয়া হল। মানুষের চোখে ধূলো দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে যুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষের সময় সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে। সকলেই এটা জানেন যুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষ ফি বছর হয়না। কোন কোন পণ্যের ক্ষেত্রে ১০০% দাম বাড়লে,সব্জির দাম ৫০% বৃদ্ধি পেলে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। মোদ্দা কথা ৯৯.৯৯% বা সব্জির ক্ষেত্রে ৪৯.৯৯% দাম বাড়ানোর ছাড়পত্র আগাম দেওয়ার ব্যবস্থা এই আইনের মাধ্যমে সুনিশ্চিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দাবি করছেন এর ফলে কৃষকের উপকার হবে। কৃষিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে। তা হয়তো বাড়বে কিন্তু তা একান্তভাবেই কর্পোরেটদের মুনাফার জন্য। আমদের রাজ্যে কমবেশি ১১ মিলিয়ন টন আলু উৎপাদন হয়। এই আলু সংরক্ষণের জন্য যে হিমঘর আছে তার ৯০ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগে তৈরি হয়েছে। এটাও ঠিক যে এই হিমঘর আলু চাষি কে পরিষেবা দেয়। কিন্তু ২০১৯-২০ সালে আলু চাষি ৭০০ টাকা কুইন্ট্যাল দামে আলু বিক্রি করেছেন, সেই আলুর দাম ৫ গুন বেড়ে এখন ৩৫০০ টাকা প্রতি কুইন্ট্যাল। বিপুল মুনাফা হচ্ছে বড়ো ব্যবসায়ীদের। চাষির কোন উপকার হচ্ছে কি? এই ২০ টি নিয়ন্ত্রণমুক্ত ফসল বৃহৎ ব্যবসায়ী বা কর্পোরেট সংস্থা যখন কৃষকের থেকে কিনবে তখন ফসলের সরকার ঘোষিত ন্যুনতম সহায়ক মূল্য প্রযোজ্য হবে এমন কথা আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলছেন না। আইনেও লেখা হয়নি। এই সংশোধনের ফলে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের আস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি ঘটবে। ক্ষতিগ্রস্থ হবে সর্বস্তরের ক্রেতা সাধারণ। আসলে সরকারের এই পদক্ষেপ কৃষি বিপণন, বানিজ্য এবং উৎপাদনে বৃহৎ পুঁজি কে কর্তৃত্বকারি ভুমিকায় প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ। দানা শস্য, ডাল, তৈল বীজ, আলু,পেয়াজ ইত্যাদি সরকারকে সংগ্রহ করতে হবে এবং গনবন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণকে সরবরাহ করতে হবে। কোনকারণেই আমাদের গনবন্টন ব্যবস্থাকে কর্পোরেট নির্ভর করতে দেওয়া হবে না।![]() প্রকাশের তারিখ: ১২-সেপ্টেম্বর-২০২১ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|